এক আছাড়ে আদনান তার ফোন ভেঙে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললো, " আমার ডিনার কই? "হূর প্রায় দৌড়ে এসে বললো, " একটু সময় লাগবে আসলে পাশে ফ্ল্যাটে আন্টি অ.... "
আর বলতে পারেনি হূর! গালে পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে যায়! আদনান ভয়ংকর কিছু কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় ওয়ালেট নিয়ে! হূর নিরব হয়ে সবটা দেখে কিচেনে ঢুকে গ্যাসটা অফ করে দেয়! রুমে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগলো হূর! আয়নার সাথেই কথা বলতে লাগে হূর, " আমি দেখতে কালো? না সুন্দর? কোনটা প্রবলেম আদনান এর আমি কালো এটা না সুন্দর এটা? দেখলেই কথায় কথায় গালে থাপ্পড় খেতে খেতে আমি ক্লান্ত! "
রাত ১২ টা,
আদনান বাসায় এসে দেখে শুয়ে আছে হূর বেডে! আদনান শুতে শুতে ভাবে কেনো এই মেয়ের জন্য তার মায়াও হয় না? শুধু শুধু মন চায় থাপড়াতে থাপড়াতে বিদায় করে দেই বাসা থেকে! জীবনটা হেল করে রেখে দিয়েছে.... আমার!
বরকে পাশে শুতে দেখে একবার চোখ খুলে তাকালো হূর আদনানের দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে! কেনো এই লোক হূরের সাথে মিস বিহেভিয়ার করে কারণ খুজে পায় না হূর!
সকালে উঠে আদনান হূরকে ডেকে খুজেও কোথাও পায় না! আদনানের মাথায় রক্ত উঠে যায়৷ ভাবতেই হূর আবার পাশের ফ্ল্যাটে গেলো না তো?? হূরের এই কাজ টা আদনানের মোটেও পছন্দ না। হূর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে আড্ডা দেয়৷ যা খুবি ইরেটেট করে আদনানকে! কিন্তু এই মেয়ে এটা বুঝেইনা।আদনানের কথা হচ্ছে! সে মেরে কেটে ফেলে দিবে হূরকে তাও সে এই ফ্ল্যাটের বাইরে যেতে পারবেনা! এটা বলেও দিয়েছে সে হূরকে কিন্তু না এইমেয়ে কথাই শুনে না তার আড়ালে হূর পাশের ফ্ল্যাটে যাবেই যাবে। এমনিতেই এই মেয়েকে বাবা মার ইচ্ছেতে বিয়ে করেছে আদনান তার তেমন পছন্দনা হূরকে। এমন না যে হূর কালো সুন্দর নয় যে পছন্দ হবেনা। তাও আদনানের পছন্দ নয় এই মেয়েকে। তার উপর এই মেয়ে তার কথা শুনে না! কিছু বললে করে না। খায়না। অসুখ বাধাতে উস্তাদ। রান্না করতে পারেনা। পুড়া আধ সীদ্ধ খেতে হয় আদনানকে। সে রেগে মাসে ২০ দিন বাইরে খায়! যেদিন বাসায় খায় সেদিন হূর থাপ্পড় খাবে গেরান্টি সেটা। কিন্তু এতো মারধর করার পড়েও একটা সাউন্ড এই মেয়ের মুখদিয়ে বের হয় না। এটা কি ধরনের বিহেভিয়ার আদনান বুঝে না। হূর ব্যাথা পেলে কাদেও না। যা আরো রাগ মাথায় উঠিয়ে দেয় আদনানের! কিন্তু সে বের করে দিতে পারেনা হূরকে মা বাবা পছন্দ করে বলে হূরকে! মা বাবা কষ্ট পাবে ভেবে এই যন্ত্রণাকে সহ্য করছে আদনান আজ ৫ মাস ধরে!
শুধু জানে না আর কতদিন সহ্য করতে পারবে সে? আদনান একজন স্কুল টিচার ২ বছর হবে সে চাকরি করছে। ৯ টা বাজে স্কুলের জন্য বেরুতে হবে তাকে! আর হূরের খবর নেই। আদনান রেডি হয়ে না খেয়ে চলে গেলো স্কুলে! স্কুলে ঢুকতেই ফোন এলো শ্বশুর এর নাম্বার থেকে রিসিভ করে কানে রাখলো ফোন আদনান৷
ঐপাশ থেকে হূর এর গলা শুনতে পেলো আদনান হূর সালাম দিয়ে বললো, " আমি চলে এসেছি বাসায় টেনশন নিও না! তোমার আমাকে প্রয়োজন নেই! যাকে প্রয়োজন যেমনটি প্রয়োজন পছন্দ করে নিও! রাখছি আল্লাহ হাফেজ! "
এই টুকু বলেই রেখে দিলো হূর৷ আদনান পাত্তা দিলোনা হূর এর কথা বরং ভালো লাগলো আপদ আপাদমস্তক নিজেই তার ঘাড় থেকে নেমেছে।
সে দিব্বি কিছুদিন ভালো পার করলো। শুধু কাপড় টা তার ধুতে হয় যা খুব কষ্ট বাকি সবে কোনও প্রবলেম হয়না! সে আগেও হোটেলে বেশী খেতো এখনো খায়৷ টাকা বেশী যায় তাতেকি মজার খাবার খেতে একটু বেশী টাকা তো লাগবেই। স্কুল শেষে ভার্সিটি ফ্রেন্ড দের সাথে আড্ডা দিয়ে রাতে ফিরে ঘুম নিয়ম করে গ্রামে মা বাবার সাথে কথা। সে ভুলেই গেলো তার বৌ নামক একটা কেউ আছে!
এভাবে ১ মাস যাওয়ার পর একদিন হঠাৎ! তার শ্বশুর আসে হূরকে নিয়ে। হূরের বাবা সাধাসিধে গ্রামের মানুষ। তিনি মাফ চান আদনান এর কাছে হূর যদি কোন ভুল করে থাকে তো যেনো আদনান তাকে ক্ষমা করে দেয়। তিনি মাফ চেয়ে রেখে যায় হূরকে। বাবা যাওয়ার পর হূর হেচকি তুলে কাদছিলো। আদনান এভাবে তাকিয়েছিলো হূরের দিকে জেনো আবার এসেছে হূর এখানে। তাই চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে হূরকে! আদনান আর কিছু না বলে চলে যায় বাসা থেকে বেরিয়ে!
হূরের একটু ভয় কমে সে পুরো ফ্ল্যাট কোমরে শাড়ীর আঁচল গুজে পরিস্কার করে। ১ মাসে ফ্ল্যাটকে জঙ্গলে পরিনত করেছে আদনান৷ সব পরিস্কার করে হাফিয়ে উঠে হূর। ফর্সা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে! সে শাওয়ারে ঢুকে দ্রুত! তারপর খুজে বিস্কিট খেয়ে ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তার আজ তিন দিন ধরেই জ্বর ছিলো সেটারি ঔষধ নিলো হূর।
বরাবরের মতো ১২ টার দিকে আদনান খেয়ে বাসায় ফিরে রুমে ঢুকে দেখে হূর নেই। রুমের বাইরেও না দেখে অন্য রুমে উঁকি দিতেই দেখে ঘুমিয়ে আছে হূর। আদনান খেয়াল করে ফ্ল্যাট চকচক করছে। সে খুশী মনে ঘুমুতে যায় তার রুমে । আজ কতদিন পড় শান্তিতে ঘুমাবে পরিস্কার বিছানায়। কিন্তু নিজের রুমে এসে সব নোংরাই দেখতে পায় আদনান। সে রেগে হূরের রুমে যায় গিয়ে ধপাশ করে হূরের পাশে শুয়ে পড়ে! হূর সাথে সাথে ঘুরে ঘুমের মধ্যে আদনানকে জরিয়ে ধরে! সাথে সাথে আদনান ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় হূরকে! হূরের শরীর এতো গরম যে মনে হয়েছে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা খেয়েছে আদনান। দ্রুত আদনান হূরের কপালে হাত রেখে রেগে বলে উঠে, " শুরু হয়ে গেছে! এসেই আমায় জ্বালানো! আমি পারবো না ডক্টর এর কাছে যেতে যা খুশী হোক স্টুপিড গার্ল! "
বলেই আদনান নিজের রুমে চলে যায় রাগে গজগজ করতে করতে!
..................
হূর ঘুম থেকে উঠে দেখলো আদনান তাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে! হূর আস্তে করে আদনানকে সরিয়ে উঠে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আদনান এর রুমটা গুছালো। কাল ভয়ে এইরুমে ঢুকেনি সে যদি আদনান আবার এটানিয়ে কিছু বলে!
হূর গিয়ে নাস্তা বানাতে লাগলো। আদনান ৮ টায় ঘুম থেকে উঠে বসতেই! নাকে সুন্দর স্মেল এলো। আদনান চোখ ঢলতে ঢলতে কিচেনে গেলো। হূর মন দিয়ে গোসত ভুনা করছে আর চালের রুটি বানাচ্ছে! আদনান এসব দেখে চোখ বড় বড় করে বললো, " গোসত কই পেলে বাসায় তো ছিলো না? "
হূর এর মন চাইলো বললতে, " চুরি করেছি! "
কিন্তু বললো না এটা বললে একটা টর্নেডো আসবে যা তার গালে পাঁচ আঙুলের দাগ করে দিয়ে যাবে তাই! সে বললো, " মা আপনার জন্য দিয়ে দিয়েছে এসব "
আদনান কিচেন থেকে চলে যেতে যেতে ভাবলো সে খাবে না। তারপর আবার ভাবলো না স্মেল তো ভালোই আসছে খাওয়া যেতে পারে! ফ্রেস হয়ে রেড়ি হয়ে ডাইনিং গিয়ে দেখলো হূর খাবার বেড়ে দাড়িয়ে আছে। আদনান আর কিছুনা বলে খেয়ে চলে গেলো। হূর দরজা লাগিয়ে রুমে এসে ধুপ করে শুয়ে পড়লো বেডে। জ্বর কমেনি দুর্বল লাগছে শরীল খুব হূর আবার ঘুম দিলো৷
এভাবে ১মাস চলে গেলে আদনান লখ্য করলো হূর আগের থেকে তার সাথে কম কথা বলে। বলে না বললেই চলে৷ পাশের রুমে ঘুমিয়ে থাকে। পাশে ফ্ল্যাটেও আর যেতে দেখেনা৷ একদম চুপচাপ বসে থাকে। রান্নাও ঠিক হয়েগেছে। আধসিদ্ধ, পোড়া খেতে হয়না। সুন্দর স্মেল বের হয় রান্না থেকে। একদম পার্ফেক্ট রান্না খেতেও মজা! আদনান এখন বাসায়ই খায়৷ হূর এখন আদনান এর সব কথা শুনে ভুল হয় না কিছুতেই! আদনান বুঝতে পারে হূর চেঞ্জ হচ্ছে কিন্তু কিছুই বলেনা কারণ চেঞ্জ হলেই তো ভালো। এখন অনেকটা প্যারা মুক্ত আদনান৷
রাত ১১টা আদনান স্কুলের খাতা দেখছে! পাশের রুমে হূর শুয়ে পরেছে খাওয়া দাওয়া শেষে সব গুছিয়ে! হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ কানে এলো আদনানের সে চেচিয়ে বললো হূরকে, " এই মেয়ে কলিংবেল বাজছে শুনতে পারছো না? যাও দেখো কে এসেছে? "
হূর আস্তে করে উঠে গেলো দরজা খুলতে৷ কিন্তু খোলার আগে লুকিং গ্লাস এ দেখতে পেলোই পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি দাড়িয়ে৷ হূর উনাকে দেখে আর খুললো না। পিছন ফিরে রুমে যাবে দেখলো আদনান দাড়িয়ে তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হূর বললো, " পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি খুলতে হবে না! "
বলে হূর নিজের রুমে চলে গেলো। আদনানের হূরের কথাটা ভালোলাগেনি। সে হূরের রুমে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, " কেনো? খুলতে হবে না কেনো? আমার সামনে ঐ মহিলার সাথে কথা বললে ধরা খাবে নিশ্চয়ই? "
হূর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বললো, " আপনার উনাকে পছন্দ না তাই খুলিনি...! "
আদনান চেচিয়ে উঠে, " শাট আপ। মিথ্যে কথা বলবে না। একদম না৷ বলো ঐ ফ্ল্যাটে ঘণ্টার পর পর ঘণ্টা থেকে কি করো তুমি? "
হূর ফোফাতে লাগলো কান্না করে দিবে দিবে অবস্থা! জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বললো, " আদনান এসব কি বলছো? "
আদনান রেগে আর কিছু বলবে। তার আগেই হূর ফ্লোরে বসে পরলো! হূর কাদতে কাদতে বললো, " প্লিজ আর ছোট করবেন না আমায় প্লিজ...দোয়া করুন৷ আমি অনেকদিন বলতে চেয়েছি! আমি কেনো যাই ঐ আন্টির কাছ! আপনি শুনার আগেই আমার গায়ে হাত তুলেছেন! তাই বলতে পারিনি এটা কি আমার দোষ? আজ আপনি না যেনেই আমায় কোন কিছুর অপবাদ দিতে পারেন না। না কিছুতেই না! "
হতভম্ব হয়ে গেলো আদনান। কারণ হূরের কথা সত্যি সে শুনেইনি কি বলতে চায় হূর! তার আগেই রেগে গিয়েছে। সে কি করবে ঐ পাশের ফ্ল্যাট সংক্রান্ত কোন কথা শুনার আগেই তার মাথা গরম হয়ে যায়! কিন্তু সেটার দোষ তো আর তার বৌ এর নয়। আদনান এর ভেতরের ভালো মানুষটি আজ বললো। না আদনান তুই ভুল।
আদনান কিছু বলবে তার আগেই হূর আবার বললো, " ঐ বয়স্ক আন্টি ডিভোর্সি! উনি উনার বুড়ো মা নিয়ে একাই থাকেন। আন্টি জব করে সকালে যায় আসতে রাত হয় জ্যাম এর জন্য। বুড়ো মা বাসায় একা থাকে। আমিও একা থাকি জেনে আন্টি আমার কাছে বলে যায় উনার বুড়ো মাকে একটু গিয়ে দেখে আসতে যদি কিছু হয়ে যায়। বুড়ো নানু হাটতে পারেনা আমারো ভয় হয়ে যদি পড়ে টরে ব্যাথা পায়? তাই না গিয়ে পারিনা। আর গেলে নানু উনি ছাড়তে চায়না বুড়ো মানুষ গল্প জুড়ে দেয়৷ উনাকে কষ্ট দিয়ে আসতে পারিনা! এটাই আমার বিরাট অপরাধ তাই তো! আর যাই না উনি ডাকলেও রাতে এসে দরজা খুলিনা! এতেও আপনার প্রবলেম? আপনি আমায় পছন্দ করেন না জানি সেটা তাই বলে এইসব লেইম চিন্তাভাবনা করবেন না আমার ব্যাপারে। "
এইটুকু বলেই চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ হূর। আদনান মূর্তির মত দাড়িয়েই রইলো৷ হূর আবার বললো, " আমার বয়স কত আপনি জানেন?? জানতে চেয়েছেন কখনও? আচ্ছা আমিই বলছি! আপনার সাথে আমার বিয়ের ১৫ দিন পর আমি ১৮ তে পাদি! যখন আমার স্কুলে কলেজে পড়ার কথা। বাবা মা বিয়ে দিয়ে দেয়। তার কারণ ছেলে ভালো শিক্ষিত এবং শিক্ষক বলে কথা। আমার বাবার মতে শিক্ষকরা। আর যাই হোক স্ত্রীকে অসম্মান আর মূর্খের এর মতন গায়ে হাত তুলবে না। কারণ মূর্খ মূর্খই হয় এরা এসব বুঝেনা৷ তাদের এই চিন্তা ভাবনায়! আমি ছোট সেটাও তাদের চোখে পড়েনি৷ আপনার সাথে বিয়ের পর এতছোট বয়সে মা বাবাকে ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে হঠাৎ শহরে এসে আমি ভয় পেয়ে যাই৷ আমি তখনি বুঝতাম আপনার আমাকে পছন্দ নয়৷ আপনার ব্যাবহার এ ভয়ে আমি সব গুলিয়ে ফেলতাম৷ শুরু হয় কাজে একের পর এক ভুল৷ বিয়ের এক মাসেই আমি বেশ কিছুবার থাপ্পড় খাই আপনার হাতে। ভয়ে ভুল আরো বারতে থাকে। এর মধ্যে আন্টি এসে উনার মার কথা বলে। আমার অদের ফ্ল্যাটে যাওয়া শুরু হয়৷ আমার ভুল সুধরাতে পারিনা। আর আপনার বিহেভিয়ার আরো খারাপ হয়৷ আমার কি দোষ বলুন আমি সুধরাতে পারনি কারণ আমি ঘরের কাজ একদমি পারতাম না..! "
হূর আবারো জোরে কাদতে লাগলো। সে পারে না ঘরের কাজ এটা জেনো তার কত কষ্ট হচ্ছে বলতে৷
আদনান এখনো একি ভাবে দাড়িয়ে! তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। হূর এর বয়স সে জানতো না। কিন্তু ১৮ মাত্র এটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলোনা সে৷ হ্যাঁ বয়স কম ভেবেছিলো কিন্তু এতো কম ভাবেনি সে৷ আর আজকের মতো লজ্জা সে গ্রামের শিক্ষিত ছেলে হয়ে কখনো কাউর থেকে পায়নি। যতটা আজ হূরের কথায় পেলো।
হূর বেশকিছু ক্ষণ কেদে চোখ মুছে বলে উঠে, " আমাকে আপনার পছন্দ নয় এটা আমার দোষ নয় আপনার দোষ ও নয়৷ তবে আপনি চাইলে বিয়ে ভাঙতে পারতেন আমি পারতাম না। আমার ইচ্ছে ছিলোনা বিয়ে করার পড়ার স্বপ্ন ছিলো খুব করে৷ কিন্তু তাও মা বাবা কথার উপর কথা বলতে পারিনি ছোট বলে আপনি পারতেন কিন্তু করেনি। কিন্তু এভাবে তো আর চলেনা৷ আপনি আমার বাবাকে বলে দিয়েন আমায় এসে নিয়ে যেতে!কারণ আমি বললে তারা বিশ্বাস করবে না আপনি আমায় পছন্দ করেন না। কারণ তাদের মতে আপনি তো শিক্ষক আর ভালো মানুষ। আপনি খারাপ কিছু করতেই পারেন না আমার সাথে। তাই আপনাকেই বলতে হবে বাবাকে! "
হূরের কথা শেষ হতেই আদনান চলে গেলো রুম থেকে হূর কান্নার ভেঙে পড়লো। আজকেও আদনান বললো না৷ সরি হূর চলো নতুন করে শুরু করি আমাদের ভুল গুলো ভুলো৷ না আজকেও আদনান বললো না। হূরের কপালে হ্যাসবেন্ড, সংসার, স্বপ্ন কিছুই নেই! কেনো? কেনো? কেনো?
..,.......
আদনান ওয়াশরুমে ঢুকে ঝড়না ছেড়ে দাড়িয়ে আছে৷ কান দিয়ে তার ধোঁয়া বের হচ্ছে। এমন লাগছে তার! লাগবে নাই বা কেনো? আজকের মতো লজ্জা সে আগে পায়নি। কোনদিন না। একটা বাচ্ছা মেয়ের উপর অনেক জুলুম করে ফেলেছে আদনান। সত্যি কোম হাত উঠায়নি। তার উপর আজ উল্টো কিছু বলেই ফেলছিলো!
আদনান আর কিছু ভাবতে পারলো না! ওয়াশরুমে প্রায় দু'ঘন্টার মতন দাড়িয়ে ভিজেছে! তারপর রুমে এসে দেখে হূর এই রুমে আসেনি৷ আদনানের আর ডাকতে ইচ্ছা হলো না। তবে হূর জরিয়ে ঘুমুলে ঘুম ভালো হয় আদনানের। কিন্তু আজ নিজেও ঐরুমে যেতে পারবেনা। আদনান মুখ লুকুচ্ছে যেমন হূরের থেকে৷ শুয়ে পড়ে আদনান আজ একাই৷
পাশের রুমে কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে পড়ে হূরও। সকালে ঘুম ভাঙে হূরে আজ দেরিতেই। উঠে দেখে ১০ টার উপরে বাজে৷ হূর দ্রুত পাশের রুমে যায়। আদনান নেই হূর আবারও কান্না করে দেয়৷ কি আছে তার কপালে আল্লাহই জানে। হূর ভাবছে৷ সে কাল কেনো এতসব বলতে গেলো কেনো? এখন যদি আদনান সত্যি বাবাকে বলে দেয় তাকে নিয়ে যেতে৷
দিনটা পার হয়ে গেলো হূরের গলা দিয়ে কিছু নামলো না সারাদিন ভয়ে! ৫ টায়র দিকে আদনান বাসায় এসে চুপচাপ শুয়ে থাকে হূর কিছুক্ষণ আদনান এর দিকে তাকিয়ে বললো, " আদনান? "
আদনান আস্তে করে বললো, " জ্বর এসেছে! ঔষধ থাকলে দাও! "
হূর আর এক সেকেন্ড দেরি করলোনা। দ্রুত আদনানকে ধরে একটু ফ্রেস হয়ে চেঞ্জ করতে বলে৷ হূর সব এগিয়ে দেয়৷ আদনানকে বেডে শুইয়ে দিয়ে। হূর কিচেনে এসে খাবার প্লেট এ করে নিয়ে আদনানকে বহু কষ্টে একটু খাইয়ে দেয়৷ তারপর ঔষধ খাইয়ে দিতেই আদনান ঘুমিয়ে যায়! হূরের কোলে মাথা রেখেই। হূর শুধু শুধুই কেনো জেনো একটু হাসে!
দুদিন চলে যায় আদনানের জ্বর বেড়ে যায়৷ স্কুল থেকে ছুটি নিতে হয়৷ ডক্টর দেখাতে হয়৷ দুদিন হূর শুধু আদনানের জ্বর কমাতেই ব্যস্ত ছিলো৷
৫ দিনের দিন আদনান এর জ্বর কমে। সে এখন মোটামুটি সুস্থ। আদনানের মা বাবা ফোন করে হূরের প্রশংসার পঞ্চমুখ তাদের ছেলের খুব খেয়াল রাখে। হূর না থাকলে কে করতো তাদের ছেলেকে সুস্থ অচেনা শহরে?
এসব শুনে আদনান এর খুব রাগ হয় মা বাবার উপর। কারণ তাদের কথায় সে হূরকে বিয়ে করেছে হূরের বয়স কম তারাতো জানতো। কি করে পারলো এতো ছোট্ট একটা মেয়েকে নিজের ২৫ বছর এর ছেলের বৌ করতে! যদিও অনেক কিছু আদনান বলতে পারতো তার মা বাবাকে৷ কিন্তু বলেনি কষ্ট পাবে ভেবে। কিন্তু সে অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলো৷
পরদিন সকালে নাস্তার পর হূর রুমে আসতেই আদনান বললো, " হূর?? "
হূর আস্তে করে বলে, " জ্বী কিছু করতে হবে? "
"হ্যাঁ রেডি হয়ে নাও বাইরে যাবো তোমায় নিয়ে? "
হূর এর আর সাহস হয়না আদনানকে প্রশ্ন করার! কই যাবে তাকে নিয়ে! শুধু ভয় হতে থাকে হূরের বাবার বাড়ীতে রেখে আসবেনা তো তাকে? চোখে পানি চলে আসে এটা ভেবেই হূরের!
সারেদশটার দিকে হূরে হাত ধরে বিল্ডিং থেকে বের হয় আদনান। হূর তো অবাক আদনান রাস্তায় তার হাত ধরেছে? কি করতে যাচ্ছে আদনান??
আদনান হূরকে নিয়ে তার কলেজে যায়। হূরকে ভর্তি করার সকল কথা পরিচিত স্যারের সাথে বলে আসে৷ যেহেতু বছরের মধ্যে ভর্তি। তাই একটু দৌড়া দৌড়ি করতে হবে তাও। আদনান সিধান্ত নিয়েছে সে পরাবে তার বৌকে৷
কলেজ থেকে বেরিয়ে আদনান তার খুব কাছের বন্ধুর বাড়ী যায়৷ আদনানের বন্ধুর বৌ হূরকে দেখে তার নাম দিয়েছে পুতুল৷ কারণ হূর পুতুলের মতোই দেখতে৷ সারাদিন বন্ধুর বাসায় থেকে হূরকে নিয়ে বাড়ী ফিরে আসে আদনান৷ হূর সারাদিন রোবট তাজ্জব বোনলে যেমন লাগবে সেরকমই দেখাচ্ছিলো। আজ হূর অন্য এক আদনানকে দেখেছে। আর দশটা স্বামী স্ত্রীর মতো আজ আদনান হূর ছিলো এ এক অন্য অনুভূতি হূরের৷ আদনান আজ খুব ভালো ব্যাবহার করেছে হূরের সাথে আজ যা এই ৫ মাসের মধ্যে করেনি৷ আর কলেজে ভর্তির ব্যাপারটার জন্য হূর একটুও প্রস্তুত ছিলো না। সে কিছুই বিশ্বাস করতে পারছেনা!
আদনান ফ্রেস হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরুলে। হূর তাকিয়ে থাকে আদনান এর দিকে! চিন্তে পারছেনা যেমন আদনানকে হূর। আদনান হূরকে কিছুই বলেনা৷ শুধু কপালে চুমু এঁকে দিয়ে হূরকে জরিয়ে ধরে নিয়ে শুয়ে পড়ে বেডে। হূর কান্নায় ভেঙে পড়ে তাতে।
তারপর ৪টি বছর চলে যায় না। হূরকে ছাড়েনি আদনান। হূর ভালো আছে আদনানের সাথে এখন ঐদিনের পর আদনান নিজেকে চেঞ্জ করে নিয়েছে৷ অনেক ভালোবাসা দিয়ে নিজের করে রেখেছে সে হূরকে। কিন্তু ক্ষমা চায়নি কোনদিন হূরের কাছে কখনও। যদিও এখন আদনান মন বলে একটি বা হূরের কাছে ক্ষমা চাইতে ভালোবাসি বলতে কিন্তু পারেনা কই জানি সামান্য ইগো কাজ করে। আদনান বুঝে স্বামী স্ত্রীতে ইগো থাকা ঠিক না। তাও ইগো টাই যেনো জিতে যায় বারবার৷
হূর এখন অনার্স এর স্টুডেন্ট। পড়াশোনা স্বামী সংসার শ্বশুর শাশুড়ী সব সামলিয়েছে সে৷ খুব ভালোবাসা দিয়ে আদনানকে আগলে রেখেছে আগের পিচ্ছি আর পিচ্ছি নেই সবি বুঝে এখন। আর আদনান কে পাগলের মতো ভালোবাসে আগের সব কিছুই দূরস্বপ্ন ছাড়া কিছুই মনে হয়না তার৷ হূর সব ভুলে গিয়েছে৷
আজ হূরের জন্মদিন। আদনান তার মা বাবাকে নিয়ে ঘরে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করেছে! কিন্তু সকাল থেকে হূরের শরীল বেশি ভালো নয়৷ সন্ধ্যায় না পেরে ডক্টর এর কাছে গেলে আদনান হূর জানতে পারে তাদের ঘরে নতুন অতিথি আসতে যাচ্ছে। হূরকি খুশী হবে কি আদনান তার দিগুণ খুশী চেম্বার থেকে বেরিয়ে আদনান বললো, " হূর কই আমি আজ তোমায় গিফট দিবো তুমিই আমায় দিয়ে দিলে?? "
হূর লজ্জিত হেসে বললো, " থ্যাংক ইউ আদনান সব চমৎকার ভাবে বদলে দেওয়ার জন্য! "
আদনান কিছু বলতে পারেনা। সে আর তার মা বাবা এতো অন্যায় করেছে হূরের সাথে তাও হূর কিছু বছরে সব ভুলে আজ তাকে থ্যাংক ইউ বলছে আর সে তার মিস বিহেভিয়ার এর জন্য আজো একদিন সরি টুকু বলেনি? ছেলে মানুষ হলে এতো ইগো সম্পর্কে থাকাকি আধো ভালো। না আজ সে সরি বলবে। বলেই যাই হয়ে যাক মনের কথাটাও বলবে৷ আর কোন সংশয় মনে রাখবেনা আদনান। ভাবতে ভাবতেই বাড়ী ফিরে আদনান!
বাসায় ফিরে আদনান এর মা বাবা এই নিউজ দিলে তারা খুশীতে আটখানা হয়ে যায়। সাথে হূরের সেই আন্টি আর নানু। হূরের জন্মদিন এর খুশী দিগুণ হয়ে যায়৷ রাতে সবাই এক সাথে খাওয়া দাওয়া করে। কথাবার্তা চলে বেশ সময় ধরে। আন্টি নানু বিদায় নেয়। আদনান এর মা বাবাও ঘুমুতে যায়৷ সব গুছিয়ে হূর নিজের রুমে গিয়ে দেখে জানালার সামনে মন মরা হয়ে দাড়িয়ে আছে আদনান। হূর জরিয়ে ধরে আদনান কে পিছন থেকে। আদনান হূরে হাত ধরে থাকে। হূর কিছুক্ষণ পড় বলে উঠে, " তুমি খুশী নও আদনান? আমাদের বেবির জন্য?"
আদনান দ্রুত হূরের দিকে ফিরে বলে উঠে, " আমাকে তোমার খুব খারাপ মনে হয় না হূর? "
হূর হেসে বলে, " একদম না। আপনি খারাপ হলে ভালো কে? আপনি আমার লক্ষ্মী বর বুঝেছে! এখন বলুন আজকের দিনে মন খারাপ কেনো? "
আদনান এবার হূরের চোখে চোখ রেখে বললো, " আমি আজ অনেক খুশী হূর অনেক। তোমায় এতো অবহেলার পরেও তুমি আমায় পরিপূর্ণ করেছো সব সময়। তুমি ধৈর্য ধরেছো। খারাপ ভালো সময় আমার পাশে থেকেছো। তোমার মতো একজনকে পেয়ে আমি খুব খুশী। শুধু আমায় ক্ষমা করে দিও হূর আমার ভুল গুলোর জন্য।আই লাভ ইউ হূর। অনেক ভালোবাসি তোমায়! "
হূর হতবিহ্বল হয়ে গেলো। কারণ এই তিন টা ম্যাজিকাল ওয়ার্ড জীবনের প্রথম কাউর মুখে শুনলো হূর আর সেটাও তার এই রাগী নরম মনের বরটার থেকে। হূর আজ সব পেয়ে গেলো মনে হচ্ছে। হূর আদনানকে জরিয়ে ধরে বললো, " আই লাভ ইউ টু। কিন্তু ক্ষমা কেনো চাইছেন? আদনান যা হয় ভালোই হয়৷ যদি হুট করেই পেয়ে যেতাম সব হয় তো মূল্য বুঝতাম না সেগুলোর। কষ্ট করে ধৈর্য ধরে বুঝতে শিখেছি সব পেয়েছি৷ তাই জীবনের সব কিছু আমার কাছে এখন অনেক মূল্য বান। আল্লাহ ধৈর্যের পরিক্ষা নেন এক সময় ঠিকি সুখ দেন। আমাকেও দিয়েছে। অনেক ভালোবাসি আপনাকে। "
অদের সম্পর্ক এর পড়ে আরো গাঢ় হয়! ভালোবাসা দিগুণ হয় ৷ ৯ মাস পর হূরের একটি মিষ্টি দেখতে মেয়ে হয়৷ আদনান নাম ও রাখে "মিষ্টি!"
......সমাপ্ত.....
লিখেছেঃ রোজা ইসলাম
কমেন্ট করতে ক্লিক করুন
আপনার ফেসবুক আইডি দিয়ে কমেন্ট করুন
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভালোবাসার ছোট একটা গল্প || হুর || অণুগল্প | Aduri Pakhi - আদুরি পাখি এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।