ব বাবু!"এদিক ওদিক এলোমেলো খুঁজতে থাকা নজর থমকে গেল মুহুর্তেই। সুপরিচিত সেই ডাকটা আজ নিজ কর্ণে প্রবেশ মাত্র স্থির হলো পদদ্বয়। ঠোঁটে ফুটল অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু খুশির ঝলক। পেছনে ফিরে সেই কাঙ্খিত মানবীর দেখা পাবে এই খেয়ালটাই যেন হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রবল বেগে। দাঁতের নিচে ঠোঁট কামড়ে শূন্যে তাকিয়ে হাসলো খানিকটা। অতঃপর মাথা ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকালো রাকিব। দেখতে পেল লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে। যাকে এমুহূর্তে পৃথিবীর সেরা সুন্দরীর মুকুটটা পড়াতে মন চাইছে রাকিবের। যদিও এই নারী তার চোখে সর্বদাই সুন্দরী! সে যে রুপেই হোক। তবে আজকের মুহূর্তটাই আলাদা। কারণ আজ প্রথম সে সরাসরি সশরীরে চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছে এই রমণীকে। আজকের বাতাসেই যেন এক অন্যরকম মোহনতা। মুগ্ধ দৃষ্টি রমণীতে আবদ্ধ রেখে ধীরে ধীরে পদযুগল অগ্রসর করল রাকিব। একসময় তার কাছে সামনে এসে দাঁড়াল সে। হৃৎস্পন্দনের গতি এলোমেলো হচ্ছে ক্রমাগত। দৃষ্টি রমনী ব্যতিত অন্যথায় হেরফের হচ্ছে না। তার এমন একাগ্র দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখতে পারছেনা সম্মুখের রমণীটি। নজর নুইয়ে এদিক ওদিক পালাচ্ছে যেন। নার্ভাসনেস লুকাতে শাড়ির আঁচলের কোণ আঙুলে পেঁচাচ্ছে সে। তার এসব কর্মকাণ্ডে যেন অনেজ মজা পাচ্ছে রাকিব। মুচকি হেঁসে দেখে যাচ্ছে সে। অতঃপর মুখ খুলল,
"এখনো কিশোরীদের মতো লজ্জা পাও! তবে মন্দ লাগছে না। ভালোই লাগছে দেখতে।"
মোহিনী এই পর্যায়ে নিজের লজ্জাকে সাহসিকতার আড়ালে লুকানোর মিছে চেষ্টা করে বলল,
"একদম না। কই লজ্জা পেলাম আমি! আর এটা কোনো লজ্জা পাওয়ার বয়স নাকি! বুড়ী বয়সে আবার লজ্জা!"
"হ্যাঁ লজ্জা পাবে কেন! তুমিতো প্রথম থেকেই লুচু ছিলা। লজ্জাতো সব এই আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ।"
এই পর্যায়ে মোহিনী চোখ কুঁচকে তাকালো রাকিবের পানে। মুখ চোখা করে বলল,
"এসেই শুরু হয়ে গেলা তাইনা! তুমি আর শুধরালানা।"
"আরে এত শুধরে কি হবে! সেইতো ভার্জিন থেকেই আধবুড়ো হয়ে গেলাম।"
"ধ্যাৎ! কি বলো এসব! চুপ করো।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ সবসময়তো খালি চুপই করিয়ে গেলা। কখনোতো আর আমার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করলা ন।"
"হইছে আপনার দুঃখপ্রকাশ! এখন চলো কোথাও বসি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলবা নাকি!"
"আমারতো শুয়ে শুয়ে বলার ইচ্ছে। কিন্তু তুমি মানলে তো!"
গরম চোখে তাকালো মোহিনী। রাকিব হেঁসে দিয়ে বলল,
"আচ্ছা সরি,চলো বসি। চলো পার্কের কোনো বেঞ্চে বসি।"
দুজন রমনা পার্কের ভেতরের দিকে এগুলো। মোহিনী মাথা নুইয়ে হাঁটছে। আর রাকিব তার পানে নজর রেখে। রাকিবের নজর পড়ল মোহিনীর লাল রেশমি চুরি পড়া হাতের দিকে। এই হাতটা ধরার লোভ তার কত বছরের! আজ যেন সেই লোভ পূরণ করার সময় এসেছে। রাকিব সময় ব্যয় করলোনা। নিজের হাত বাড়িয়ে মোহিনীর হাত ধরলো। মোহিনীর কোমল হাতের তালুতে তালু মিশিয়ে আঙুলগুলোর মাঝে নিজের আঙুলগুলো খাপে খাপে মিলিয়ে নিয়ে নিবিড় ভাবে ধরলো সেই হাত। মোহিনী সেটা অনুভব করলেও তাকালোনা সেদিকে। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ভালো লাগার রেখা টানলো ঠোঁটে। হাত ধরেই হাঁটল দুজন। হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় একটা ফাঁকা বেঞ্চে এসে বসলো ওরা। রাকিব হাত ছাড়লোনা মোহিনীর। হাতটা মুঠোয় ধরেই বসে রইলো সে। রাকিব বলল,
"কি হলো, তুমিতো আমার দিকে তাকাচ্ছোই না। আমি কি সরাসরি দেখতে এতোটাই খারাপ! "
"আরে তুমি একটু চোখ সরালেনা আমি দেখবো! একটু চোখ অন্য দিকে নাওনা আমি একটু দেখি।"
"সেটা তোমার প্রবলেম! আমিতো তোমাকেই দেখবো। আজকের একটা সিঙ্গেল মুহুর্তও আমি অন্য কিছু দেখতে চাইনা। তুমি এমনেই দেখো।"
"প্লিজ একটু অন্য দিকে তাকাও না!"
"আচ্ছা বাবা, নাও।"
রাকিব মোহিনীর কথা রাখতে একটু চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। তখন মোহিনী দেখলো তার সম্মুখের পুরুষটাকে। অনেকক্ষণ খুঁতিয়ে খুতিয়ে অবলোকন করলো তাকে। অতঃপর বলল,
"তুমি আগের থেকেও অনেক হ্যান্ডসাম হয়ে গেছ।"
রাকিব মুচকি হেঁসে বলল,
"৩৫+ প্লাস বয়স। এখন আর হ্যান্ডসাম! তুমি এখনো চাপা মারা শিখলে না।"
"কারণ আমি সত্যি বলি তাই। আর এখনো তাই করছি। তুমি সত্যিই অনেক হ্যান্ডসাম হয়ে গেছ। বয়সের সাথে তোমার সেই আগুন সৌন্দর্য আবার ফিরে এসেছে।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ আমি জানি আমি অনেক হট। এখনতো তোমার কাছে এসে হটনেস ওভারলোড হয়ে যাচ্ছে।"
হাসিমুখে কথাটা বলে মোহিনীর দিকে তাকাতেই দেখলো মোহিনী কেমন একধ্যানে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ কেমন চিকচিক করছে তার। তার এই একাগ্র নজরে রাকিব স্থির হলো। মজা করে বলল,
"এভাবে কি দেখছ? খেয়ে ফেলবা নাকি! ফেলো আম রেডি। একটুও আস্ত রেখোনা। পুরো খেয়ে ফেলো।"
ফিক করে হেসে দিলো মোহিনী। সেই হাসির ঝলকে রাকিবের হৃদকুঞ্জ আলোকিত। রাকিব বলল,
"আমি যতোই সুন্দরী হই তোমার রুপের আগুনে বারাবারই পুড়ে যাই। আজও ঝলসে যাচ্ছি।"
"এখন কে চাপা মারছে শুনি! চুলে পাক ধরেছে, চামড়ায় ভাজ পড়ছে। বুড়ীর আবার সৌন্দর্য!"
রাকিব নাক ফুলিয়ে বলল,
"তুমি আর ভালো হলেনা তাইনা! মানে মুডের বারোটা কিভাবে বাজাতে হয় তা খুব ভালো করে পারো তুমি! আজও সেটা করা জরুরী! কতবার বলবো তুমি যেমনই হও, আমাদের মাঝে যত বয়সেরই ব্যবধান থাকুক না কেন, তুমি আমার চোখে সেরা সুন্দরী। আমি তোমার কিশোরী মনটাকে ভালোবাসি। তোমার বাহ্যিক রুপ কেমন সেটাকে না। আজ ১০/১২ বছরের সম্পর্ক আমাদের। তাও শুধু ফোনের মাধ্যমেই। এতদিন পর এভাবে দেখা করতে আসলাম আমরা! আমি কি চাইলে খুঁজে নিতে পারতাম না কাউকে!"
বলেই মোহিনীর হাত ছেড়ে দিয়ে অন্য দিকে ঘুরে বসলো রাকিব। জনাব ক্ষেপে গেছে তা বুঝতে পারল মোহিনী। সে এবার নিজ থেকে রাকিবের হাতটা জড়িয়ে ধরলো মুঠোয়। অপরাধী সুরে বলল,
"সরি,প্লিজ মাফ করে দাও। তুমিতো জানোই আমি একটু ডাম্ব। একটু না, অনেক বড় ডাম্ব। আজকের দিনেও রাগ করে থেকোনা প্লিজ!"
রাকিব অন্য দিকে ঘুরে থেকেই বলল,
"শুকনো কথায় চিড়ে ভিজবে না। অন্য কিছু করো।"
"কি করবো?"
"এখন কি এটাও আমাকে বলতে হবে! থাক লাগবেনা কিছু করার। ছাড়ো আমাকে। চলে যাবো আমি।"
মোহিনী বুঝতে পারল রাকিবের কথার মানে। কিন্তু সে যা বোঝাতে চাইছে তাকি করা সম্ভব! মোহিনীর পক্ষেতো না। মোহিনীর মুখটা মলিন হয়ে গেল। রাকিব ফিরে তাকালো তার পানে। মোহিনীর উদাস চেহারা দেখে সে বলে উঠল,
"এই পাগলী,তোমার কি মনে হয়, তোমার এই পুরুষটা কি এতটাই অভদ্র! এই পাবলিক প্লেসে তোমাকে ওমন কিছু বলবো! আরে আমিতো বলছিলাম বাদাম খাওয়াতে। কিন্তু তুমিতো লুচু। তাই মনে খালি লুচু চিন্তাই আসে।"
হাসি ফুটল মোহিনীর মুখে। সে বলে উঠল,
"আমার সেই ইচ্ছেটা কি আজ পূরণ হবে!"
"কোন ইচ্ছে?"
"তোমার সাথে সারারাত ব্রেঞ্চে বসে কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে।"
"তুমি কি পারবে?"
"হ্যাঁ পারবো। আজ আর কোনো বাঁধা নেই। আর কোনো পিছুটান নেই। আর কোনো দায়িত্বভার নেই। এখন আমার সব সময় শুধু তোমার।"
"তাহলে আমার হাত ধরে চলো। সায়াহ্নের সূর্যাস্তের সাক্ষী হই দুজন।
নাহয় এলে একটু অবেলায়
তাতে কি!
শেষে মিলিত হলেতো এক মোহনায়।",
________সমাপ্ত
সাঝের বেলায় তুমি আমি
মেহরুমা নূর
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ছোট গল্প: | সাঝের বেলায় তুমি আমি | ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প | ADURI PAKHI - আদুরি পাখি এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।