হৃদয় জুড়ে শুধুই তুই
পর্বঃ- ৫৪
__________
সিঁড়ির নিচের ফুল গুলো কি কাজে রাখা হয়েছে কয়েক সেকেন্ড ভেবেও যখন কোনো উত্তর খুঁজে পেলোনা আয়াশ তখন অয়নকে জিজ্ঞেস করে বসল--- " অয়ন! ঐ ফুলগুলো কেন আনা হয়েছে রে? দেখে তো মনে হচ্ছে আজকেই আনা হয়েছে। বিয়ে তো শেষ হয়ে গেছে। তাহলে আজ আবার ফুল আনা হয়েছে কেন?"
আয়াশের কথায় সবাই সিঁড়ি রুমের দিকে তাকালো। অয়ন ফুল গুলোর থেকে চোখ সরিয়ে আয়াশের দিকে তাকালো। মুচকি হেসে বললো--- " তুই শালা তো কাল বাসর রাতটাই স্পয়েল করে দিলি সেই কথা মনে আছে? কালকের ফুল গুলো বাসী হয়ে গেছে। তাই আজকের জন্য আবার নতুন করে এনে রাখা হয়েছে।"
অয়নের কথায় বেশ অবাক হলো আয়াশ। অবাক কণ্ঠে বললো--- " আজব, আমি কেন বাসর রাত স্পয়েল করতে যাব? আমি তো.......
" মাঝরাতে কেউ নেশা করে বাড়ি ফিরলে বাসর রাত তো স্পয়েল হবেই। আচ্ছা আয়াশ তুই আবার ড্রিংক করতে শুরু করেছিস কবে থেকে বল তো।"
আয়াশের সামনে নাস্তার প্লেট রাখতে রাখতে কথাগুলো বললেন রুকসানা বেগম। মায়ের কথায় আয়াশ অবাক হয়ে তাকালো মায়ের দিকে। অবাক কণ্ঠে বললো----
" মা কি সব বলছো? আমি ড্রিংক করতে যাব কেন? যেখানে সিগারেট পর্যন্ত খাইনা সেখানে ড্রিংক করব তাও আমি? আর তুমি তো জানোই আমার যেসব ফ্রেন্ডরা নেশা করে আমি তাদের সাথে পর্যন্ত মিশিনা। আর তুমি বলছো আমি ড্রিংক করা কবে থেকে শুরু করেছি?
" তাই নাকি? তাহলে কাল রাতে এক্সেক্টলি কয়টায় বাড়ি ফিরেছিস বল তো? "
সাথে সাথে আয়াশ মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু মনে করতে গিয়ে আয়াশ নিজেই অবাক হয়েছে। আয়াশের কাল রাতে বাড়ি ফিরার কথা একটুও মনে নেই। শুধু মনে আছে ও কাল রাতে বারে গিয়েছিল। আর অনেক গুলো ড্রিংকের অর্ডার করেছিল। ড্রিংক করা অব্দি আয়াশের মনে আছে। কিন্তু তারপরে কবে বাড়ি ফিরেছে কিভাবে বাড়ি ফিরেছে কিছুই মনে পড়ছেনা। ড্রিংক করার কথা মনে পড়তেই আয়াশ মাথা নিচু করে ফেলল সাথে সাথে। অপরাধী গলায় বললো----
" মা আসলে আ ব ব আ...
" তার মানে মনে পড়েছে তাহলে? যাক ভালোই হলো। আমার কষ্ট করে আর মনে করিয়ে দিতে হলোনা। কাল রাতে হুশ ছিলোনা বলে কিছু বলিনি। তাই বলে আজও যে কিছু বলবোনা সেটা কিন্তু নয়। তোকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছিলাম যে মাঝরাতে নেশা করে বাড়ি ফিরছিস? কাল কি করেছিস জানিস তুই? নিজেকে অনেক বড় ভাবতে শুরু করে দিয়েছিস। নয়তো মাঝরাতে নেশা করে বাড়ি ফিরতিস না তাও আবার এমন একটা দিনে। আর নেশা করেছিস তো করেছিস, সবাইকে যা নয় তাই বললি। আনিসা তোর জন্য কি না করেছে। তোকে আমার থেকে বেশি ও কেয়ার করে। তুই শেষ পর্যন্ত ওকে পর্যন্ত ছাড়লিনা। ও তোর কোন পাঁকা ধানে মই দিয়েছিল বলবি একবার? যদি আনিসার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে না নিস না তাহলে আমাকে আর মা বলে ডাকবিনা খবরদার।"
রুকসানা বেগমের কথাগুলো শুনে আনিসা বেগম কিচেন থেকে দৌঁড়ে সেখানে আসলেন। মূলত উনিই আসতেন আয়াশের নাস্তা নিয়ে। কিন্তু উনি চুলায় রান্না বসিয়েছিলেন তাই রুকসানা বেগমকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু রুকসানা বেগম যে আয়াশকে বকবে সেটা উনার মাথায় ছিলোনা। থাকলে রান্নাটা রুকসানা বেগমকে দেখতে বলে উনি নিজেই আসতেন। আনিসা বেগম আয়াশের সামনে একটা পানির গ্লাস রেখে আয়াশের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললেন---
" আয়াশ নে লেবুর শরবতটা আগে খেয়ে নে। শরবতটা খেলে মাথা ধরাটা একটু কমবে। নয়তো সারাদিন এভাবেই ভার হয়ে থাকবে। আর ভাবি তোমাকে সকাল থেকে কতবার বলেছি যে ওকে কিছু বলোনা। তারপরেও তুমি কাল রাত নিয়েই পড়ে আছো৷ ছেলেটা নাস্তা করতে বসেছে। এখন কি এসব বলা খুব জরুরি? আয়াশ তুই ভাবির কথায় কান দিসনা। নাস্তা করে নে।"
আয়াশ এতক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলেও আনিসা বেগমের কথা শুনে অসহায় চোখে তাকালো আনিসা বেগমের দিকে। অপরাধী গলায় বললো---
" ছোট মা সত্যিই আমি কাল তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি? আ ব আসলে আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি নিজের ইচ্ছায় এসব করিনি। বিশ্বাস করো ড্রিংক করার কোনো ইচ্ছা ছিলোনা আমার। কিন্তু কি করব বলো, ইশার বিয়েটা অয়নের সাথে হয়ে গেছে কথাটা মনে পড়লে আমার বুকের ভিতর দাউদাউ করে আগুন জলতে থাকে। নেশা করা ছাড়া আর উপায় পাচ্ছিলামনা এসব ভুলে থাকার। তাই বাধ্য হয়ে..... প্লিজ ক্ষমা করে দাও আমায়। প্রয়োজনে আমাকে মারো আমি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার কেন করেছি তার জন্য। তারপরেও আমার উপর রাগ করে থেকোনা প্লিজ।
" আয়াশ মারব একটা। আমি কি একবারও বলেছি আমি তোর উপর রাগ করেছি? বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি লেবুর শরবতটা খেয়ে নাস্তা করে নে। কাল রাতেও খাসনি। তুই রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে আমরা না খেয়ে বসে থাকতে দেখলে বকাবকিস করিস দেখে আমরা সবাই আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তুই বাড়ি ফিরলে তোকে খেয়ে নিতে বলবো। কিন্তু বাড়ি ফিরার পর তোকে যে খেতে বলবো ঐ পরিস্থিতি ছিলোনা। তুই খুব বেশি ড্রাংক ছিলি তখন। আচ্ছা এসব বাদ দে, এখন তাড়াতাড়ি নাস্তা করা শুরু কর তো দেখি।
" ছোট মা সত্যিই তুমি আমার উপর রাগ করে নেই তো?
" আবারও একই কথা? বলেছিনা কথা না বলে খাওয়া শুরু কর। আগে শরবতটা খেয়ে নে। তাড়াতাড়ি কর। নয়তো আমি জোর করে খাইয়ে দিবো বলে দিচ্ছি।"
আয়াশ আর না পেরে অবশেষে আনিসা বেগমের কথায় লেবুর শরবতটা খেয়ে নিলো। যদিও আয়াশ তেমন লেবুর শরবত খেতে পছন্দ করে না। কিন্তু ছোট মা'র কথাও আবার ফেলতে পারছেনা। তাই বাধ্য হয়ে নাক মুখ কুঁচকে অনেক কষ্টে শরবতটা খেয়েছে।
" গুড। এখন খাওয়াটা শেষ কর। আর হ্যাঁ, আর কিছু লাগলে বলিস। আমি কিচেনে যাচ্ছি। ভাবি চলো। তুমি এখানে থাকলে আয়াশকে বকাবকি করবে। দেখি চলো তো। আয়াশ পুরোটা না খেয়ে উঠলে তোর কিন্তু খবর আছে। "
বলতে বলতে আনিসা বেগম রুকসানা বেগমকে জোর করে টেনে নিয়ে কিচেনে চলে গেলেন। আয়াশও ইতোমধ্যে খাওয়া শুরু করেছে। তখনই আয়াশকে শুনিয়ে শুনিয়ে ইশা বললো----
" বুঝলে অয়ন, মাঝরাতে বাড়ি ফিরে কেউ মাতলামি করলেও আম্মুর কাছে সে একদম নির্দোষ। আর আমি যদি সামান্য মাছিও মারি তাহলেও আমি দোষী যে আমি কেন মাছিটা মেরেছি।"
ইশার কথা শুনে আয়াশ এক নজর ইশার দিকে তাকিয়ে আবারও খাবার খেতে লাগল। অন্য সময় ইশার এমন পিন্স মারা কথা শুনে আয়াশ রিয়েক্ট করলেও আজ আয়াশ একদম নিশ্চুপ। খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ ফারহার দিকে তাকিয়ে আয়াশ বললো---
" ফারহা কাল রাতের জন্য আই এম সরি।"
আয়াশের কথা শুনে ফারহা হাসল। মুচকি হেসে বললো--- " ধুর পাগল, আমাকে সরি বলছো কেন? আমাকে তো তুমি কিছু বলোইনি। তবে এইটুকু বুঝতে পেরেছি যে তুমি ইশাকে অনেক ভালোবাসো। আর এটা নিয়ে আমার কিন্তু অনেক জেলাস হচ্ছে ইশার উপর। কেউ কাউকে এতোটা কিভাবে ভালোবাসতে পারে সেটা তোমাকে কাল রাতে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। বেশির ভাগ ছেলেরাই দেখা যায় একজনের সাথে প্রেম করবে আর বিয়ে করবে অন্য মেয়েকে। আর তুমি কিনা তার পুরোটাই উল্টো। ইশাকে এতোটাই ভালোবাসো যে কালকের মতো একটা দিনে তুমি ড্রিংক করে বাড়ি ফিরেছ যাতে সবটা ভুলে থাকতে পারো। আমার কিন্তু সত্যি ইশার উপর জেলাস হচ্ছে।
" আমার উপর সত্যিই রাগ করোনি তো?
" একদমই না। আমি জানি আমি চাইলেও কোনো দিন ইশার জায়গাটা নিতে পারবনা। তাই শুধু শুধু রাগ করে কি করব। আমার ইশাকে যতোটা ভালোবাসো ততোটা ভালোবাসা চায়না। জাস্ট একটু ভালোবাসা দিলেই হবে।
" থ্যাংকস আমাকে এতোটা বুঝার জন্য। "
ইতোমধ্যে ফারহার সাথে কথা বলতে বলতে আয়াশের খাওয়া শেষ। আয়াশ উঠে অয়ন আর ইশার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর পকেট থেকে একটা খাম বের করে অয়নের দিকে এগিয়ে দিয়ে ম্লান হেসে বললো---
" অয়ন এটা তোদের জন্য। "
আয়াশের হাত থেকে খামটা নিয়ে একবার খামটার এপিঠ ওপিঠ দেখে নিয়ে অয়ন বলল---
" কি এখানে?
" তোদের হানিমুন ট্রিপ। ইশার অনেক ইচ্ছা ছিলো ওর হাসবেন্ডকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড যাবে। আর সেখানে তাদের ভালোবাসাটা লাভলক ব্রিজে তালা বন্ধ করে আসবে। এখন তো তুই ওর হাসবেন্ড। তাই তোদের জন্য আমার পক্ষ থেকে ছোট্ট উপহার। আশা করি তোদের ভালো লাগবে। ইশা তোর পছন্দ হয়েছে গিফট? তোর বিয়েতে তো কিছু দিতে পারিনি। তাই তোদের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার স্পনসারশিপটা আমি নিলাম। আর তাছাড়া আমি তোকে বলেছিলাম মনে আছে? তোদের হানিমুনের স্পনসারশিপটা আমি করব। তাই এই ছোট্ট গিফট। আশা করি তোদের দুজনের পছন্দ হয়েছে। আর হ্যাঁ, পারলে এই অধমটাকে ক্ষমা করে দিস। আর অয়ন তোকে বলছি, যদি ওখানে গিয়ে কোনো রকম ফাইনানসিয়াল হেল্প লাগে সঙ্গে সঙ্গে আমায় কল করতে পারবি। যদিও আমি তোদের জন্য যেই হোটেলের বুকিং দিয়েছি সেটার পুরো খরচটা পে করে দিয়েছি। ঐ হোটেল থেকে যতো কিছু খাবি বা নিবি কিছুর জন্য তোদের টাকা পে করতে হবেনা। কিন্তু তারপরেও বাইরে ঘুরাঘুরির জন্য যদি কোনো ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট লাগে আমাকে একটু করে বললে হবে। আমি আমার সবটা দিয়ে হেল্প করার ট্রাই করবো। "
কথাগুলো বলে আয়াশ চলে যেতে নিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই অয়ন ডেকে উঠল--"আয়াশ শোন"
আয়াশ পিছন ফিরে তাকালো। অয়ন মুচকি হেসে বললো--- " শুধু কি আমরাই যাব তোরা যাবিনা? ইশার মতো ফারহারও তো কোথাও না কোথাও যাওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে।
" তোরা চলে যা। আমি ফারহার সাথে কথা বলে আমরা অন্য সময় যাব। আর ফারহারও যে সুইজারল্যান্ড যাওয়ার ইচ্ছা থাকবে এমন তো নয়। ওর তো অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা থাকতে পারে। আমরা পরে যাব। তোরা আগে চলে যা।
" ওকে, তুই যদি যেতে না চাস কি করার আছে? তবে থ্যাংকস এতো এক্সপেন্সিব একটা গিফট দেওয়ার জন্য।
" ওয়েলকাম।
" তা আজ তো বাসর। কি প্রস্তুতি নিলি?"
বাসর রাত শব্দটা শোনার সাথে সাথে আয়াশের বুক ছিঁড়ে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। মলিন হেসে বললো---
" এখানে প্রস্তুতি নেওয়ার কি আছে? যখন যেটা হবে তখন দেখা যাবে।
" একটা রিকোয়েস্ট করলে রাখবি?
" হ্যাঁ বল।
" আজ প্লিজ কালকের মতো ড্রিংক করিসনা।
" ঠিক আছে। আজ আর আমার জন্য তোদের স্বপ্নটা ভঙ্গ করব না।
তখনই মিলি বললো--- " আয়াশ এটা কিন্তু আমারও রিকোয়েস্ট। কারণ তুই যদি আজ নেশা না করে স্বাভাবিক থাকিস তাহলে আমি কিন্তু আজ বড়লোক হয়ে যাব। "
মিলির কথা শুনে আয়াশ না চাইতেও হেসে দিলো। হেসে বললো----
" আমার নেশা করা না করার সাথে তোর বড় লোক হওয়ার কি সম্পর্ক? আর তাছাড়া তুই কোনো লটারি নিয়েছিস যে আজ তার ড্র হবে আর তুই সেটা জিতে বড় লোক হয়ে যাবি?
" না তা কেন হবে? আমার লটারি নিয়ে বড়লোক হতে হবে কেন? আমার দুই দুইটা বড়লোক ভাইয়ের বাসর আজ। আমি তো সালামি পেতেই পারি। মনে রেখো যদি টাকা না দাও না আমায় তাহলে একটাকেও বাসর ঘরে ঢুকতে দিবোনা। তালা মেরে আমি চাবি আমার কাছে রেখে দিবো বলে দিচ্ছি।
" এএএহহহ, আসছে তালা মেরে চাবি ওর কাছে রেখে দিবে। একটা টাকা ও দিবোনা। দেখি তুই কি করতে পারিস। বউ আমার বাসর আমার তোকে টাকা দিবো কোন দুঃখে হ্যাঁ?"
অয়নের কথায় মিলি মুখ বাঁকিয়ে বললো---
" আচ্ছা রাতে দেখা যাবে কার বাসর আর কার বউ। যখন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তখন বুঝতে পারবি কত ধানে কত চাল। আর কত চালে কত ময়দা।
" হ্যাঁ হ্যাঁ দেখা যাবে।"
ওদর ভাই বোনের ঝগড়া দেখে আয়াশ এবার সশব্দে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বললো----
" আচ্ছা তোরা কি ছোট বাচ্চা হয়ে গেছিস? বাচ্চাদের মতো কি সব বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছিস? মিলি তুই টেনশন করিস না। অয়নের সালামি সহ তুই আমার কাছ থেকে নিয়ে নিস। তারপরেও বেচারাকে বাসর ঘরে ঢুকা থেকে বঞ্চিত করিসনা।"
ফারহা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। তবে ওদের কাছে আসছেনা। যদি ওর আসাতে আয়াশ আনইজি ফিল করে তাই। ফারহা বেশ ভালো ভাবে বুঝতে পারছে আয়াশ মুখে হাসিটা অটুট রাখলেও ওর ভিতরটা পুড়ে হাহাকার হয়ে যাচ্ছে। ফারহা ভেবে কুল পায়না একটা মানুষ কাউকে এতোটা ভালো কি করে বাসতে পারে। ওদের হাসি ঠাট্টার মাঝেই রায়হান মাহমুদ আর হাসান মাহমুদ এসে উপস্থিত হলেন। উনারা মূলত বাজারে গিয়েছিলেন। যদিও আজ অফিস খোলা ছিলো। কিন্তু গত কয়েকদিন বিয়ে নিয়ে দৌঁড় ঝাপ করায় কেউই আজ আর অফিস যাননি। দুজনেই এসে সোফায় বসলেন। রায়হান মাহমুদ বসতেই ইশা উঠে রায়হান মাহমুদের পাশে গিয়ে উনাকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ল। রায়হান মাহমুদও কোনো রকম রিয়েক্ট করলেন না। বরং মুচকি হেসে উনিও এক হাতে ইশাকে জড়িয়ে ধরেছেন। সবাই মিলে এটা সেটা নিয়ে কথা বলছিল। তখনই হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ শোনা গেল। যদিও দরজাটা খোলাই ছিলো। কিন্তু হুট করে তো আর কারো ঘরে ঢুকে পড়া যায় না। তাই বোধহয় আগন্তুক ব্যক্তিটি নক করেছে। দরজায় নক করার শব্দ কানে আসতেই সবাই দরজার দিকে তাকালো। একটা পিওন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াশ পিওন ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো--- "চিঠি এসেছে বুঝি?"
ছেলেটি সৌজন্য সূচক হেসে বললো--- "জি। এক্সুয়েলি সংসদ থেকে চিঠি এসেছে। "
সাথে সাথে অয়ন বলে উঠল--- "আয়াশ তাহলে নির্ঘাত তোর জন্য এসেছে। যা গিয়ে দেখ কি এসেছে।"
অয়নের কথায় আপত্তি করে আয়াশ বললো--- "সংসদ থেকে এসেছে তো? তাহলে আমি ডেম শিউর চিঠি আমার জন্য নয় তোর জন্য এসেছে।
তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললো--- "আচ্ছা চিঠি কার নামে এসেছে?"
"জি আদনান আবেদীন অয়ন নামে।" পিওনের মুখে নিজের নামে চিঠি এসেছে শুনে অয়ন বেশ অবাক হলো। সংসদ থেকে চিঠি আসলে তো আয়াশের নামে আসার কথা ওর নামে এসেছে কেন? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অয়ন পিওন ছেলেটির দিকে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির কাছ থেকে চিঠির খামটা নিয়ে ছেলেটিকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলো। তারপর আবারও আগের জায়গায় এসে বসে পড়ল।
" আচ্ছা আয়াশ চিঠি তো তোর নামে আসার কথা। তাহলে আমার নামে আসলো কেন? "
অয়নের কথা শুনে আয়াশ হাসলো। হেসে বললো--- "পড়েই দেখ। তাহলে বুঝতে পারবি।"
অয়ন খাম থেকে কাগজটা খুলে কয়েক লাইন পড়তেই আয়াশের দিকে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে বললো--- "আয়াশ আমার মনে হয় এখানে নাম ভুল এসেছে। এটা আমার চিঠি নয় তোর চিঠি হবে।"
" সংসদ থেকে এসেছে তো? তাহলে কোনো ভুল হয়নি। ঠিক নামেই এসেছে।
" মানে?
" মানে হলো সংসদে আমি নয় তুই শপথ গ্রহণ করতে যাবি।
" আয়াশ তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? কি সব বলছিস? নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলি তুই জিতলি তুই আমি কেন শপথ গ্রহণ করতে যাব?
" কারণ আমি কোনো নির্বাচনে অংশ গ্রহণ ও করিনি আর জিতিও নি। সবাই জানে আমি ইলেকশন করেছি। তুইও জানতিস আমি ইলেকশন করেছি। কিন্তু শুধু আমি আর কমিশনার জানত যে আমি নই তুই ইলেকশন করেছিস। আমি উনাকে বলেছিলাম তোর অনেক শত্রু তাই তোর আইডেন্টিটি টা যেন সবার থেকে আড়াল রেখে আমার আইডেন্টিটি টা যেন সামনে আনা হয়। তাই কেউ ব্যাপারটা জানতে পারেনি। ইনফ্যাক্ট আমি নিজেই চাইনি কেউ বিষয়টা জানুক। তোর না খুব ইচ্ছা ছিলো রাজনীতি করবি কিন্তু মামাকে বলতে সাহস পাচ্ছিস না। তাই আমি তোর কাজটা সহজ করে দিলাম। এখন থেকে তুই রাজনীতি করবি। মামাকে যা বলার আমি বলবো। তুই টেনশন করিসনা। মামা তোকে এই বিষয়ে কিছু বলবেনা।
" কিন্তু আয়াশ রাজনীতি তো তোর করার কথা ছিলো।"
অয়নের কথা শুনে আয়াশ আবারও হাসলো। হেসে বললো--- "আমার কোনো কালেই রাজনীতি করার ইচ্ছা ছিলো না রে। আমি জাস্ট ইশা চেয়েছিল বলে ইলেকশনে অংশগ্রহণ করেছি। তাও প্রার্থী হিসেবে আমি দাঁড়ায়নি। প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছি তোকে। কেন জানিস? আমি জানতাম ইশা কয়েক দিন গেলেই আমার ব্যস্ততা মেনে নিতে পারবেনা। আমার কাছ থেকে সময় না পেলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। কিন্তু ও নিজে যেহেতু আমাকে ইলেকশন করতে বুঝাতে গিয়েছিল। তাই আমিও দেখতে চেয়েছিলাম আমার ব্যস্ততা ও কতটা নিতে পারে। আমার আসলে রাজনীতি করা কোনো কালেই পছন্দ ছিলোনা। কিন্তু তুই আমাকে একবার বলেছিলিস যেটা আমার এখনও মনে আছে। তুই রাজনীতি করতে চাস। তাই আমি মত দিয়েছিলাম। আর ইশাকেও একটু বুঝাতে চেয়েছিলাম নাটক সিনেমা আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য। সরি বাবা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার কথা রাখতে পারিনি। আমি সত্যিই দুঃখিত। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিও। "
আয়াশ ভেবেছিল ওর কাজে ওর বাবা অনেক রাগ করবে। তাই মাথা নিচু করে লাস্ট কথা গুলো বলেছিল। কিন্তু আয়াশকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আয়াশের বাবা হেসে বললেন----
" এই জন্যই বুঝি মাথা নিচু করে আছিস? পাগল ছেলে। মাথা উচু কর। মাথা নিচু করার মতো কোনো কাজ করেছিস নাকি যে মাথা নিচু করে রেখেছিস? আমাকে সরি বলতে হবেনা। আমি তোর কাজে রাগ করিনি। বরং আমার গর্ব হচ্ছে তোকে নিয়ে। আমার ছেলে যে কিনা নিজের থেকে অপরের কথা বেশি ভাবে। আই এম প্রাউড অফ ইউ আয়াশ। আই এম প্রাউড অফ ইউ। তুই যেটা করেছিস একদম ভালো করেছিস। অয়ন তুমি কাজ চালিয়ে যাও। যত রকম সাহায্য লাগবে আমরা তোমার পাশে আছি। আর হ্যাঁ, তোমার বাবা কিছু বলবে কি না বলবে এটা নিয়ে ভয় পেয়োনা। আমি নিজে তোমার বাবার সাথে কথা বলবো। "
আয়াশ এবং রায়হান মাহমুদের কথা শুনে অয়ন যে কতটা খুশি হয়েছে ও বলে বুঝাতে পারবেনা। এতোটাই খুশি হয়েছে যে খুশিতে অয়নের চোখে জল চলে এসেছে। অয়ন সাথে সাথে এগিয়ে গিয়ে আয়াশকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল।
" থ্যাংকস রে আয়াশ, তোর এই ঋণ আমি কোনো দিনও সুদ করতে পারব না। কোনো দিনও না। আমি জানি তোকে যতই থ্যাংকস দিই না কেন কম হয়ে যাবে। তারপরেও বলছি অনেক অনেক থ্যাংকস।
" শালা থ্যাংকস জানিয়ে পার পেয়ে যাবি ভাবিস না। আমাদের সবাইকে যদি ট্রিট না দিস না তাহলে তোর খবর করে ছাড়ব। কি বলিস মিলি?"
সাথে সাথে মিলি হ্যাঁ বলে লাফিয়ে উঠল। মুহূর্তেই মাহমুদ মেনশন আনন্দে ভরে উঠেছে। রুকসানা বেগম আর আনিসা বেগমও আয়াশের কাজে খুশি হয়েছেন। উনারা আসলে জানতেন না যে অয়ন রাজনীতি করতে চাই। আজই আয়াশের মুখ থেকে প্রথম শুনেছে যে অয়নের অনেক দিনের ইচ্ছা সে রাজনীতি করবে। তাই সবাই ব্যাপারটা নিয়ে খুশি হয়েছে। রুকসানা বেগম আর আনিসা বেগম তো অনেক বড় কিছু পেয়েছে এমনভাবে খুশি হয়েছে। কারণ তাদের ছেলেকে যে বিধ্বস্ত চিন্তিত ফ্যাকাশে মুখে দেখতে হবেনা আর। তারা আবারও তাদের সেই হাসিখুশি আয়াশকে দেখতে পাবে। এর থেকে বড় পাওয়া আর কি বা হতে পারে।
চলবে......
®আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ হৃদয় জুড়ে শুধুই তুই ♥ || পর্ব - ৫৪ || সেরা রোমান্টিক উপন্যাস || ভালোবাসার গল্প | AduriPakhi - আদুরি পাখি এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।
