গত একঘন্টা যাবত আমি ট্রেডমিলে ফুল স্পিডে দৌড়ে চলেছি। একবারের জন্য হলেও এক মুহুর্তের জন্য হলেও কুয়াশার ক্রন্দনরত মুখটা আমি ভুলে যেতে চাই। শিট! কুয়াশা নাকি ওর জীবনে হাতেগোনা কয়েকবার কেঁদেছে। কিন্তু আমাকে দেখো,আমার সাথে ওর মাত্র দুইবার দেখা হয়েছে। আর দুইবারই আমার জন্য ওকে কাঁদতে হয়েছে। এইবার আমি ইচ্ছে করে কষ্ট দিয়েছি ওকে। আমার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে এই মুহুর্তে।
অবশেষে বুঝতে পারলাম এক্সারসাইজ করে কাজ হবেনা। আমার কুয়াশাকে স্যরি বলতে হবে,নয়তো আমি শান্তি পাবো না। আমি ট্রেডমিল থেকে নেমে ডিভানে চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিলাম। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও শান্তি নেই। ওর মুখটা আমি কোনোমতে ভুলে থাকতে পারছি না।
"এই মেয়েটা আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে" আমি বিড়বিড় করলাম। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে জানালো 'ও তোকে পাগল বানাচ্ছে না শুভ্র। তুই আসলেই একটা ম্যাড ম্যান। কুয়াশার কোনো দোষ ছিলো না,তবুও তুই পাগলের মতো ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিস"
আহহ! যদি আমি এই সময়ে ফিরে গিয়ে সব পরিবর্তন করতে পারতাম। আমার নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে এখন। আমার রাগ বরাবরই আউট অফ কন্ট্রোল। ছোট ছোট বিষয়ে মেজাজ খারাপ হয় আমার। কিন্তু আমার কুয়াশার উপর এভাবে রাগ দেখানো একদম উচিত হয়নি।
তো কি হয়েছে যদি ও রায়হানের উদ্দেশ্য বোঝেনা?কুয়াশার আচরণে স্পষ্ট যে ও রায়হানকে নিয়ে কোনো ফিলিংস রাখেনা। আর কুয়াশা না চাইলে রায়হানের বাপেরও সাহস নেই রাদিফ আহসানের মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার। আর কুয়াশা নিজের অজান্তেই ওর ইন্ট্রোভার্ট আচরণের কারণে নিজেকে প্রটেক্ট করে চলে। ও আমার সামনে বলেছে যে ও ওর ছুটি ওর মায়ের সাথে কাটাবে,আর ও কোথাও গেলে নিজের কাছের বন্ধুদের সাথে যাবে,অপরিচিতদের সাথে না। আর আমি ওর উপর পুরো একটা রিপোর্ট পড়েছি,ও কেমন মেয়ে আমার জানা উচিত ছিলো।
তবুও রায়হানের প্রতি ওর সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ,ওর হেসে কথা বলা ওই ছেলেটার সাথে,আমার সারাদিনের দমিয়ে রাখা রাগের অনলে ওর আচরণ যেনো পেট্রোলের মতো কাজ করেছে। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। ও নিশ্চয়ই আরও ভয় পাবে আমাকে এখন থেকে। আমাকে ঘৃ'ণা করবে ও। আমার কি করা উচিত এখন?একটা মেয়ের রাগ কিভাবে ভাঙাতে হয় এই বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।
আমি ফোন ঘেঁটে সদ্য সেইভ করা কুয়াশার নাম্বারটা বের করলাম। কল বাটনে চাপ দেওয়ার সাহস হলোনা আমার,আমি নিশ্চিত ও ফোন তুলবে না,টেক্সট করে স্যরি বলার আইডিয়াটা অত্যন্ত লেইম মনে হলো আমার। শেষমেষ আমি সিফাতের নাম্বারে ডায়াল করলাম। আমার একটু ব্রেক চাই শান্তিমতো ভাবার জন্য। সিফাত ওইপাশ থেকে ফোন তুলেই অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
"সূর্য কোনদিকে উঠলো রে?আজ তুই নিজ থেকে ফোন করলি?"
আমি ওর ড্রামাটিক কথাবার্তা সম্পূর্ণ ইগনোর করে জিজ্ঞেস করলাম,
"ফ্রী আছিস?"
"ট্রিট দিলে অলওয়েজ ফ্রী"
"ক্লাবে দেখা কর যত জলদি সম্ভব। আমার নাম বললে দেখিয়ে দিবে। একা আসিস"
আমি ফোনটা কেটে দিলাম। সিফাত আমার একমাত্র ডিসেন্ট ফ্রেন্ড এখানে। যার সাথে ক্লোজ আমি। আমার ছোটোবেলার ফ্রেন্ডদের সবাই অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এমন না যে ওরা আমার সাথে মিশতে চায়না। প্রবলেম টা আমার। আমার ওদের লাইফস্টাইল পছন্দ না। আর ওদের লাইফস্টাইল সম্পর্কে জানি বলেই,রায়হান যখন কুয়াশাকে কক্সবাজার নিয়ে যেতে চায় শুনলাম তখন আমি আমার রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি। কুয়াশা খুবই সিম্পল আর ইনোসেন্ট একটা মেয়ে। ও ওই টাইপের মেয়েদের মতো নয় যাদের নিয়ে রায়হান ফূর্তি করে বেড়ায়। এন্ড আই ক্যান প্রমিজ, রায়হান কুয়াশার সাথে দ্বিতীয়বার কিছু করার চেষ্টা করলে আমি ওকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো। ওর দিকে কেউ খারাপ নজরে তাকালে ওর চোখদুটো উপড়ে ফেলবো আমি।
চৌধুরী গ্রুপের ফাইভ স্টার হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ক্লাবটা শুধু হোটেলে চেক ইন করা গেস্টদের জন্য বরাদ্দ। বাইরে কোথাও একান্ত শান্তিপূর্ণ সময় কাটাতে চাইলে একমাত্র এই জায়গাটাই বেছে নিই আমি। গত একমাস ধরে আমি আমাদের ক্লাবের রেগুলার মেম্বার হয়ে দাঁড়িয়েছি,এর ক্রেডিট একমাত্র কুয়াশা নামক মেয়েটার। একমাত্র সিফাতকে ছাড়া আমি আমার জন্য বরাদ্দ প্রাইভেট বুথে কাউকে এলাও করিনা।
আমি যখন আমার বুথে পৌছালাম তখন সিফাত অলরেডি সেখানে বসে বিয়ার গিলছে। আমি কোনো কথা না বলে টেবিল থেকে একটা ইনট্যাক্ট বিয়ারের বোতল নিয়ে ডগডগ করে গিলতে শুরু করলাম।
"ওয়াও...চিল ব্রো! এভাবে ড্রিংক করলে পেট খারাপ করবে তোর", সিফাত খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শেষ হয়ে যাওয়া বোতলটা একদিকে ছুড়ে ফেলে সিফাতের পাশে সোফায় ধপ করে গা এলিয়ে দিলাম। সিফাত এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললো,
" কি হয়েছে ব্রো?এতো হট হয়ে আছিস কেনো?ব্যবসায় কোনো সমস্যা?"
আমি আরেকটা বোতল টেনে নিতে নিতে বিতৃষ্ণার গলায় বললাম,
"ব্যবসার সমস্যা সলভ করা আরও সহজ ব্রো"
সিফাত আমার হাত থেকে জোর করে বোতলটা নিয়ে সরিয়ে রেখে বললো,
"তুই নিশ্চয়ই আমাকে এইজন্য ডাকিসনি যাতে তুই মাতাল হওয়ার পর তোকে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দেওয়ার একটা মানুষ থাকে,তাইনা? কথা ঘুরাস না শুভ্র,কি বলবি বলে ফেল।"
আমি ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম,
"তুই হাসবি না বল?আমার একটা হেল্প লাগবে,এটা অত্যন্ত সিরিয়াস ব্যপার আমার জন্য"
সিফাত এবার নড়েচড়ে বসে নিজের মুখটা যতটা সম্ভব সিরিয়াস করে বললো,
"তুই জাস্ট বল আমাকে কি হেল্প লাগবে?"
"ইয়ে...মানে..."
"আহ! এতো কি সাসপেন্স ক্রিয়েট করছিস?সোজাসাপ্টা বল কি হয়েছে?আমার ব্লাড প্রেশার হাই হয়ে যাচ্ছে"
"ধর, তুই একটা মেয়ের সাথে রাগের মাথায় অনেক বাজে ব্যবহার করে ফেলেছিস। এরপর মেয়েটাকে কিভাবে স্যরি বললে মেয়েটা সব ভুলে তোকে মাফ করে দিতে রাজি হবে?"
সাইলেন্স...পিনপতন নীরবতা। সিফাত পুরো এক মিনিট আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো, তারপর হু হা করে হাসতে শুরু করে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। এই তো,আমি জানতাম ও আমাকে সিরিয়াসলি নিবেনা। আমি সিফাতের পায়ে লা'থি মে'রে বললাম,
"শা'লা তোকে বললাম না হাসতে। আমি যথেষ্ট সিরিয়াস এই মুহুর্তে। তুই হেল্প না করলে বল,আমি চলে যাই"
সিফাত পেট চেপে ধরে হাসি থামাতে থামাতে বললো,
"ওয়াও! দ্যা গ্রেট জিনিয়াস শুভ্রও দিনশেষে সাধারণ পুরুষ বল? নারীর সামনে জিনিয়াসদেরও বুদ্ধির ভাঁটা পড়ে যায়। তা এই মহীয়সী নারীটা কে যে তোকে জব্দ করেছে?"
"তার নাম কি সেটা যদি ওকে মানাতে পারি তবেই বলবো। তোর হেল্প চাইছি কারণ তুই ৪ বছরের রিলেশনশিপে আছিস,তোর জন্য এটা কমন সাবজেক্ট হওয়ার কথা। আমাকে একটু ধারণা দে আমার কি করা উচিত"
"ওকে ফাইন। এই আর কঠিন কি?মেয়েদের মন অনেক নরম বুঝলি? একগুচ্ছ গোলাপ বা এক বাক্স চকলেট বা টেডিবিয়ার নিয়ে সোজা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াবি,তারপর কান ধরে ঠোঁট উলটে বলবি "স্যরি"। মেয়েটা মোমের মতো গলে যাবে"
"ব্রো আমি সিরিয়াস প্রবলেমের কথা বলছি এখানে"
"আমিও সিরিয়াসলি বলছি। আমি ঝুমুকে এভাবেই মানাই,আমার প্ল্যান একবারও ফ্লপ হয়নি"
আমি চোখমুখ বিকৃত করে জাস্ট কল্পনা করার চেষ্টা করলাম আমি কুয়াশাকে ওইভাবে স্যরি বলছি। ক্রিঞ্জ! ওয়াক থু! কুয়াশা এরপর আমাকে সাইকো ভেবে এড়িয়ে চলতে চাইবে সারাজীবন।
"ও ওইরকম চকলেট আর টেডিবিয়ার দেখে খুশি হয়ে যাওয়ার মতো মেয়ে না ব্রো। আর ওকে আমি যেভাবে হার্ট করেছি,আমার মনে হয়না ওকে ডায়মন্ড রিং দিলেও আমার দিকে ফিরে তাকাবে।"
"তোকে একটা কথা বলি ব্রো মনে রাখিস,যেমনই মেয়ে হোকনা কেনো দিনশেষে সব মেয়েই একজন মেয়ে। ওরা খুব অল্প কিছুতেই অনেক খুশি হয়ে যায়,আর সেটা যদি প্রিয় কোনো মানুষের প্রদত্ত হয় তাহলে সেটা তারা সারাজীবন আগলে রাখতে চায়। সেটা ডায়েরির ভাঁজে আগলে রাখা শুকনো গোলাপ হোক বা হারিয়ে যাবে বলে কখনো না পড়া দামী গয়না। তুই কি দিবি ওকে সেটা ম্যাটার করেনা,কিভাবে দিবি সেটা ম্যাটার করে। তুই যদি সত্যি স্যরি ফিল করে থাকিস,জাস্ট ওর সামনে দাঁড়িয়ে মন থেকে স্যরি বলে দে। মাঝে মাঝে আমাদের সিনিসিয়ার ওয়ার্ড কোনো বাহারী গিফট থেকে ভালো কাজ করে ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে"
ওকে, সিফাতের কথাগুলো লজিকবিহীন কথাগুলো শুনতে মন্দ নত অন্তত। ট্রাই করতে ক্ষতি নেই রাইট?এমন না যে আমার কাছে এরচেয়ে ভালো কোনো আইডিয়া আছে?এই এরিয়ায় আমার কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেই। আমার বেস্ট অপশন হলো এখন সিফাতের এক্সপেরিয়েন্স কে ট্রাস্ট করা।
"ওকে শুভ্র, ইউ ক্যান ডু ইট!"
_____________________
কুয়াশার দৃষ্টিকোণঃ
-----------------
নিজের ভালোবাসার মানুষটার মুখ থেকে কটু কথা শোনা কতটা পেইনফুল হতে পারে আমি এই মুহুর্তে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট?সিরিয়াসলি? আমি জানতাম শুভ্র আমাকে ঘৃ'ণা করা শুরু করবে আমার সাথে সময় পার করলে। কিন্তু ও আমার সম্পর্কে এতো নীচু চিন্তাভাবনা রাখবে আমি কল্পনাও করিনি। আমার লজ্জায় ম'রে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার দুই জীবন মিলিয়ে আমি কখনো এতো অপমানিতবোধ করিনি। আমি সবসময় এমনভাবে চলাফেরা করেছি যাতে আমার কারণে আমার মা বাবার সম্মানে কখনো দাগ না লাগে।
তবুও শুভ্রর কোনদিক দিয়ে মনে হলো যে আমি এমন মানুষদের সাথে চলাফেরা করি যারা আমার সাথে 'ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট' টাইপের সম্পর্ক রাখতে চায়?আমি ওর সাথে যথেষ্ট নম্রভাবে আচরণ করেছি। আমার মনে পড়েনা আমি এমন কোনো উশৃংখল আচরণ করেছি ওর সাথে যার ফলে ওর মনে এমন ভাবনা তৈরি হয়েছে যে আমি ওই টাইপের মেয়ে। আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে ওই টাইপের মেয়ে মনে করে এটা ভাবলেই লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।
আই গিভ আপ! আমি ব্যর্থ! আমি ভেবেছি ওর সামনে সংযত হয়ে চললেই ও আমাকে ঘৃ'ণা করবেনা। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি কিছু করি বা না করি,দিনশেষে ও আমাকে ঘৃ'ণা করবেই। এটা আমার ভাগ্য। আমি মেনে নিলাম এই ভাগ্য যে ওই মানুষটাকে আজীবন ভালোবাসার বদলে আমি শুধু তার ঘৃ'ণা অর্জন করার জন্য জন্মেছি। হাজার হোক আমি খলনায়িকা। আমি ওর জন্য আমার সবটা উজার করে দিলেও ও আমাকে ভালোবাসবে না।
আমি এখন থেকে চুপচাপ জাস্ট আমার কাজ করে যাবো। ওর কাছ থেকে কোনো এক্সপেকটেশন রাখবো না। নো এক্সপেকটেশন নো পেইন!
আহ এই ছেলেটার জন্য সারারাত কেঁদেছি আমি। ওর কাছে হয়তো আমার অশ্রুর দুই পয়সার মূল্য নেই। কিন্তু এই যে আমার চোখগুলো লাল হয়ে ফুলে আছে,আব্বু আম্মু দেখলে হাজারটা প্রশ্ন করবে। আর এই মাইগ্রেইনের কারণে আজ সারাদিন আমাকে ভুগতে হবে। সব আপনার জন্য শুভ্র! আই হোপ আমাদের আর কখনো দেখা না হোক। কিন্তু অবশ্যই,উনি আমাকে ভালোও বাসবেন না,আমার থেকে দূরেও থাকবেন না।
আমি বিকেলে আমার অফিসে বসে প্রেজেন্টেশন এর ফাইল রেডি করছিলাম তখন আমার দড়জায় নক হয়। আমি বেশি কিছু না ভেবেই বললাম,
"কাম ইন"
আমি ফাইল থেকে তৎক্ষণাৎ মুখ তুললাম না কে এসেছে দেখার জন্য। যে প্রবেশ করে সে সাধারণত নিজ থেকেই কথা বলা শুরু করে। কিন্তু বেশ কিছু মুহুর্ত পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন সামনের জন কিছু বললো না তখন আমার একটু খটকা লাগলো। ভ্রু কুঁচকে আমি মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলাম শুভ্র আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে সেই একই ভাবলেশহীন গম্ভীর অভিব্যক্তি,তবে আজ উনার পড়নে কোনো ফরমাল স্যুট নেই। একটা হাফহাতা সাদা টি-শার্ট আর ব্লু জিন্স। ক্যাজুয়াল পোশাকে এই প্রথম দেখা উনাকে আমার। সত্যি বলতে উনাকে এই মুহুর্তে ২০বছরের হ্যান্ডসাম কোনো কিশোরের মতো লাগছে। অন্য সময় হলে আমি উনার দিকে হাঃ করে তাকিয়ে উনাকে চোখে গিলে খেতাম। কিন্তু উনার উপর আমি অভিমান করে আছি এই মুহুর্তে। ওইযে বলেনা? ভালোবাসার পাল্লা যত ভারী হয় অভিমানের পাল্লা ঠিক ততোটাই ভারী। আমি ব্যথিত অভিব্যক্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
"আপনার সাথে আমার কোনো এপোয়েন্টমেন্ট আছে সেটা আমাকে কেউ জানায়নি মিস্টার চৌধুরী। দুঃখিত,কিন্তু আমি এখন আপনাকে সময় দিতে পারছিনা। আমার অন্য কাজ রয়েছে শিডিউলে"
"কুয়াশা...", শুভ্র বলতে শুরু করলে আমি ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিই।
" মিস আহসান ডাকতে পারেন আপনি আমাকে মিস্টার চৌধুরী। আমি আপনাকে নিশ্চয়ই আগে স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে আমরা অপরিচিত?আপনি এভাবে আমার নাম ধরে ডাকলে সবাই ভুল ভাববে যে আমি আপনার কাছের কেউ"
'বিশেষ করে আমি ভুল ভাববো শুভ্র। আপনি যখনই আমার নাম ধরে ডাকেন আমি একটু একটু করে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাই,আপনি জানেন?আমার মনে ভুলভাল ধারণার সৃষ্টি হয় যে হয়তো আমার আদোও কোনো চান্স আছে আপনাকে পাওয়ার'
শুভ্র বেশ কিছুক্ষণ কিছুই বললো না। আমি ওর দৃষ্টি আমার উপর অনুভব করতে পারছি। কিন্তু আমি চোখ তুলে ওর দিকে তাকাতে চাইনা।
"কুয়াশা,রাদিফ আঙ্কেল আমাকে পারমিশন দিয়েছে অলরেডি তোমাকে নিয়ে যাওয়ার। লেটস গো"
উনি জাস্ট আমার সম্পূর্ণ কথাগুলোই ইগনোর করলেন। আমি আশ্চর্য হয়ে উনার দিকে মুখ তুলে কঠোর কিছু বলতে যাবো,কিন্তু উনি আমার সামনে নেই। শুভ্র কখন হেঁটে এসে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আমি টেরই পাইনি। আমার কিছু বলার আগেই শুভ্র বললো,
"ওকে,মিস আহসান? আপনি আর আমি পার্টনার,মনে আছে তো আপনার?যেখানে আমি যাবো সেখানে আপনারও যেতে হবে। এই কারণটা পছন্দ হয়েছে নিশ্চয়ই?এবার আমরা যেতে পারি?"
শুভ্র আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে ঠোঁটের কোণায় একটা সূক্ষ্ম বক্রহাসির রেখা টেনে বললো। আর আমার বেইমান মনটা তখন আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু একটু করে গলে যাচ্ছিলো।
আই হেইট দিস ফিলিংস! শুভ্র আমাকে যতই হার্ট করুক না কেনো, ওর একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা আমাকে আবার ওর জন্য পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অনুভূতিগুলো অসহ্যকর!
আর আমি লক্ষ্য করলাম শুভ্র যখন আমার এক হাত নিজের মুঠোয় পুরে আমাকে তার সাথে নিয়ে যেতে লাগলো তখন আমার শরীর ওকে একটুও বাঁধা দেয়নি।
'কুয়াশা, তোমার আত্মসম্মান বলতে কিছু আছে?',আমি নিজের বিবেককে প্রশ্ন করলাম।
কিন্তু ভেতর থেকে কেউ বিদ্রুপের স্বরে জবাব দিলো,
'ঢং কম কর কুয়াশা। তুই বলতে পারবি যে শুভ্র তোর হাত ধরে হাঁটছে,সেটা তোর খারাপ লাগছে?হাহ! তোর মন পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে কুয়াশা। ইউ লাভ ইট!'
ওকে ফাইন! হ্যাঁ সত্যিই আমার ভালো লাগছে। কিন্তু আমার এতো সহজে ভালো লাগা উচিত নয়। বিরক্তিকর!
বাই দ্যা রাস্তা! এই সাইকো নায়কের মাথায় কি চলছে কি জানে। ও আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? খেয়াল করে দেখলাম আজকে কোনো ড্রাইভার নেই। উনি নিজে ড্রাইভ করছেন। আমি নিজের কন্ঠ যতটা সম্ভব গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম,
"আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
"গেলে জানতে পারবে"
ওকে! নাইস আন্সার! এরমানে উনি এরচেয়ে বেশি কিছু বলবেন না। আমিও জিজ্ঞেস করবো না আর তাহলে। উনার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। আমি এখনো যথেষ্ট রেগে আছি উনার উপর। হুহ!
কিন্তু আমাদের ডেস্টিনেশন দেখে আমি এবার প্রশ্ন না করে পারলাম না। আমরা চৌধুরী গ্রুপের ফাইভ স্টার হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। উনি পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করছেন দেখে আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
"আমরা এখানে কেনো এসেছি?"
শুভ্র নিজের সিটবেল্ট খুলে নামতে নামতে বললো,
"হানিমুনের জন্য আসিনি। ডোন্ট ওয়ারি"
আমি জাস্ট অবাক। উনি ওই গম্ভীর মুখ বজায় রেখে এমন শেইম লেস একটা কথা কিভাবে বলতে পারেন?অসভ্য সাইকো একটা!
শুভ্র আমার পাশের গাড়ির দড়জা খুলে আমার দিকে ঝুঁকে এসে বাঁকা হেসে বললো,
"সিটবেল্ট খুলোনি কেনো এখনো সুইটহার্ট?হানিমুনের জন্য আসিনি বলেছি বলে মন খারাপ তোমার? ডোন্ট ওয়ারি, হানিমুনে আমি তোমাকে পৃথিবীর বেস্ট ডেস্টিনেশন গুলোতে নিয়ে যাবো"
আমি শিওর আমাকে এই মুহুর্তে দেখতে একটা লাল টকটকে টমেটোর মতো লাগছে। লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি আমতা আমতা করে প্রতিবাদ করলাম,
"আমি এমন কিছুই ভাবিনি!"
"ওকে,তুমি এমন কিছুই ভাবোনি কুয়াশা। আই বিলিভ ইউ। এবার চলো"
শুভ্র উনার হাসিটা বিস্তৃত করে আমার সিটবেল্ট খুলতে খুলতে বললেন। এই প্রথম আমি উনাকে জেনুইনলি হাসতে দেখলাম। ইশ উনাকে হাসলে কি সুন্দর দেখায়। আমার উনার দিকে তাকানোই উচিত হয়নি। এই হাসিমুখটা এখন আমার বিনিদ্র রজনীর কারণ হবে।
"আমাকে দেখার জন্য সারাজীবন পড়ে আছে তোমার কাছে কুয়াশা। লেটস গো", শুভ্র মুচকি হেসে আমার হাত ধরে আমাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করে বললেন।
আমি লজ্জিত হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার মনটা একরাশ ভালো লাগায় ছেয়ে গেলেও উনার কথাটা একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথার উদ্রেক করলো আমার মনে।
'ভুল বললেন শুভ্র। খুব শীগ্রই আপনার আর মেঘলার দেখা হবে,তখন কুয়াশার আপনার দিকে তাকানোর কোনো অধিকার থাকবেনা। আমি এই একপাক্ষিক ভালোবাসার অনলে জ্ব'লে পু'ড়ে ম'রবো চিরকাল'
(চলবে)
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ খলনায়িকা | পর্ব - ০৭ | ভালোবাসার রোমান্টিক উপন্যাস | ভালোবাসার গল্প | Aduri Pakhi - আদুরি পাখি এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।
