আমাদের চ্যানেলে ঘুরে আসবেন SUBSCRIBE

আদুরি পাখি ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম™

সম্মানিত ভিজিটর আসসালামুয়ালাইকুম : আমাদের এই ওয়েবসাইটে ভালোবাসার গল্প, কবিতা, মনের অব্যক্ত কথা সহ শিক্ষনীয় গল্প ইসলামিক গল্প সহ PDF বই পাবেন ইত্যাদি ।

  সর্বশেষ আপডেট দেখুন →

অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ❤ | পর্ব ১৩ থেকে ১৬ | Arrange Marriage | ভালোবাসার গল্প | রোমান্টিক গল্প | AduriPakhi

Please wait 0 seconds...
Scroll Down and click on Go to Link for destination
Congrats! Link is Generated

#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৩

‘তুলি, এই তুলি? উঠো। আমার কাঁধে মাথা রেখে শোও। এভাবে ঘুমালে ঘাড় ব্যাথা করবে তো।’

তুলি এ কথা শুনে সঙ্গেসঙ্গে চোখ খুলে ফেললো। শুভ্র আচমকা চোখ খোলায় ভ্যাব্যাচ্যাকা খেয়ে তাকালো তুলির দিকে। তুলি চোখের পলক দুবার ফেলে শুভ্রর দিকে চেয়ে থাকলো। আরেকবার বলুক সে, তুলি মরিয়া হয়ে ঝাপাবে তার কাঁধে। শুভ্র বুঝলো, তুলি হয়তো শুনতে পারেনি। তাই শুভ্র গলা পরিষ্কার করে ধিমে আওয়াজে বললো,

‘ঘুমাবে তুমি? এভাবে ঘুমালে ব্যথা পাবে। অস্বস্তি ফিল না করলে আমার কাঁধে মাথাটা রাখো।’

তুলি মৃদ্যু হাসলো। লজ্জায় অবনত হয়ে হালকা সরে এসে শুভ্রর হাত জড়িয়ে তার কাঁধে মাথা রাখল পরম আবেশে। শুভ্রর গা এই প্রথম কোন নারী স্পর্শ করলো, কাঁধে মাথা রাখল। সেই নারীটা তার স্ত্রী। ব্যাপারটা কতো সুন্দর! শুভ্রর হাত যত্ন নিয়ে তুলির চুলে মালিশ করল। আরামে চোখ বুজল তুলি। শুভ্র মৃদু আওয়াজে বললো,

‘এবার নিশ্চিন্তে ঘুমাও, আ’ম দ্যায়ার!’

তুলির কথাটা কী যে ভালো লাগলো। বোধহলো শুভ্রর কাঁধে শক্ত করে মাথাটা চেপে রাখতে। তুলি একবার মাথা তুললো। শুভ্র তাকাল। তুলি বললো,

‘থ্যাংকস, সবকিছুর জন্যে।’

শুভ্র হাসলো খানিক। তুলি আবার আরাম করে শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজলো।
______________
বাস এসে থেমেছে দিঘীনালিতে। এখান থেকে আর কোনো বাস যাবে না। বাকিটা পথ যেতে হবে চান্দের গাড়ি করে। চান্দের গাড়ি মূলত একপ্রকার জিপ গাড়িই। সাজেকের সবাই এটাকে জিপ না বলে সুন্দর ভাষায় চান্দের গাড়ি বলে। তুলি বাস থেকে নেমে মুখে পানি ছেটালো। ঘুমে চোখ খুলতে পারছে না সে। শুভ্রর হাতে সব ব্যাগ। সে একপাশে ব্যাগ রেখে তুলির কাছে গেলো। বললো,

‘চা খাবে তুলি? ঘুম কাটবে তাহলে।’

তুলি হামি ছেড়ে বললো,

‘খাবো, আপনি?’

শুভ্র হেসে উত্তর দিল,

‘চায়ে কখনও আমার ‘না’ নেই।সর্বদা হ্যাঁ।’

তুলি হেসে ফেললো। হেসে হেসে আনমনে বললো,

‘ভালোই হয়েছে দুজন চা পাগল। মাঝরাতে চাঁদ দেখতে দেখতে কয়েক কাপ চা সাবাড় করা যাবে।’

শুভ্র হাসলো। তুলির তার সংসার নিয়ে কত ইচ্ছে। তাঁকে নিয়ে কত স্বপ্ন! ব্যাপারটা শুভ্রর ভীষণ ভালো লাগলো। শুভ্র মুচকি হেসে চা আনতে গেল।

চা খেয়ে সবাই চান্দের গাড়িতে চড়ে বসলো। ওদের ছয় জনের জন্যেই একটাই চান্দের গাড়ি লেগেছে। ছয় সিটে ছয়জন।

সাজেকের পথটা বেশ বন্ধুর। বারবার তুলি গাড়ির ধাক্কায় শুভ্রর উপরে পড়ে যাচ্ছে। ওড়নাও ঠিকঠাক জায়গায় থাকছে না। স্যারদের সামনে তুলি একপ্রকার নাস্তানাবুদ অবস্থা। শুভ্র হয়তো বুঝতে পারলো। ফিসফিস করে বললো,

‘ওড়নায় পিন দিয়ে দাও, খুলবে না আর।’

তুলি তাই করলো।তুলি ঠিকঠাক বসতে পারছে না দেখে, শুভ্র বাম হাতে তুলির কাঁধ ধরে নিজের সঙ্গে চেপে ধরেছে। তুলি শুভ্রর দিকে চেয়ে। শুভ্র নিরন্তর বসে গল্প করছে আরিফ ফারহানের সাথে অথচ এখনো একহাতে তুলিকে আগলে আছে। তুলি শুভ্রর যত্নে আরও একবার তার প্রতি ভালো বাসা জন্মালো। মানুষ হিসেবে কতটা অসাধারণ শুভ্র, সেটা কী শুভ্র কোনোদিন জানবে? তুলিকে এতটা সেইফ অনুভব করানো, এতটা যত্নে এতদূর নিয়ে আসার জন্যে তুলির শুভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে, সেটাও কী এই শুভ্র মহোদয় জানবে? তুলি একদিন জানাবে। সব জানাবে।

একদিন পূর্ণিমা রাতে, দুজন বারান্দার দোলনায় দোল খেতে খেতে চাঁদ দেখবে। তখন তুলি শুভ্রকে জানাবে, কাবিনের পর কিভাবে তুলি একটু একটু করে শুভ্রর প্রেমে পড়েছিল। একটু একটু করে দুজন কাছাকাছি এসেছিল। একটু একটু করে তুলি দুর্বল হয়েছিল এই মানুষের প্রতি। তুলি বলবে, একদিন অবশ্যই বলবে। সেও জানুক, পুরুষ হিসেবে সে কতটা, ঠিক কতটা অসাধারণ!
__________________
সাজেকে একটা রিসোর্ট নেওয়া হয়েছে, সাজেক ইকো ভ্যালি রিসোর্ট। শুভ্ররা রিসিপশনের কাজ সামলে যে যার রুমে ঢুকলো। তুলি রুমে ঢুকেই বিস্ময় নিয়ে চারদিক দেখল। কাঠের দরজা, দেয়াল, বিছানা। সবই কাঠের তৈরি।সামনে খোলা বারান্দা, তুলি বারান্দায় গেল। শীতল হাওয়া বইছে। তুলির খুব ভালো লাগল। শুভ্র বারান্দায় এসে তুলির পাশে দাঁড়াল। তুলি বললো,

‘ভীষণ সুন্দর রিসোর্টটা, আমার ভালো লেগেছে।’

শুভ্র মৃদ্যু হাসলো। বললো,

‘সাজেকের মোস্ট অফ দ্য রিসোর্ট এরকমই থাকে। এটাই সাজেকের বিশেষত্ব।’

‘আমরাও একদিন এমন একটা ঘর বানাবো, কাঠের সবকিছু থাকবে, এরকম একটা খোলা বারান্দা থাকবে। কোন কৃত্রিম সাজসজ্জা থাকবে না। যা থাকবে সব প্রাকৃতিক। রুমের চারপাশে একধরনের লম্বা মোমবাতি পাওয়া যায় যে, ওগুলো থাকবে। মনে হবে, আমরা ধূলোবালিজমা শহরে নয়, গ্রামে কোনও এক পাহাড়ের উপরে থাকছি। বেস্ট হবে জানেন?’

কথাটা বলে বেশ আনন্দ নিয়ে শুভ্রর দিকে ঘুরল তুলি। শুভ্র স্থির চোখে চেয়ে দেখছে তুলিকে। তুলি হাসছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে তৃপ্তির হাসি। শুভ্র আনমনে চেয়ে আছে তুলির মুখের দিকে। শুভ্র এভাবে চেয়ে আছে দেখে তুলি ভ্রু নাচিয়ে হেসে হেসে জিজ্ঞেস করল,

‘কী দেখছেন?’

‘তোমাকে।’

তুলি ভ্রু কুচকে ফেললো। সঙ্গেসঙ্গে শুভ্র থমকে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লজ্জা এবং অস্বস্তি দুজনকেই ঘিরে ধরল। শুভ্র ইতিওতি চেয়ে নিজেকে সামলে বললো,

‘ফ্রেশ হয়ে নাও, বাথরুমে সব রাখা আছে।আমি পড়ে ঢুকব।’

কথাটা বলেই শুভ্র আগেআগে বারান্দা থেকে রুমে ঢুকে গেলো। তুলি পেছনে দাঁড়িয়েই রইল। টালমাটাল চোখে চেয়ে রইলো শুভ্রর চলে যাওয়ার দিকে। খানিক পর মৃদু হেসে নিজেও ঘরে ঢুকলো।শুভ্র বিছানায় বসে আছে। তুলি সেদিকে একবার তাকিয়ে টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। শুভ্র মাথা তুলে তাকাল তখন। আজ মূলত তার হচ্ছেটা কী? নিজেকে এতটা অদমনীয় মনে হচ্ছে কেন? তুলি সামনে থাকলে এতটা উতলা হয়ে যাচ্ছে কেন? শুভ্র মাথার চুল খামছে ধরে থাকল, মাথাটা বড্ড ধরে আছে আজ। প্যারাসিটামল খেতে হবে একটা।

তুলি গোসল করে বের হয়েছে। টাওয়াল দিয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। শুভ্র অন্যদিকে চেয়ে আছে। তুলি বললো,

‘আমি এসে গেছি। গোসল করবেন না আপনি?’

শুভ্র সঙ্গেসঙ্গে উঠে গেলো। একনজর তুলির ভিজে চুলের দিকে চেয়ে দ্রুত পায়ে স্যান্ডেল পরে টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে চলে গেলো। তুলি তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইল শুভ্রর যাওয়ার দিকে।

শুভ্র গোসল থেকে বের হলো প্রায় আধা ঘণ্টা পর। সারাদিন জার্নি করে গায়ে মনে হচ্ছে ধুলোর বস্তা লেগে আছে। তাই আজ গোসলে বেশ দেরি হয়ে গেছে তার। তুলি তখনও চুল ঝাড়ছে। কোমর অব্দি বেশ ঘন চুল তুলির। চুল ঝাড়তেও বড্ড কষ্ট হচ্ছে তুলির। হাত মনেহচ্ছে ভেঙে আসছে।তুলির চুলের পানিতে মেঝে পুরো ভিজে গেছে।
শুভ্র টাওয়াল দিয়ে নিজের চুল মুছে বললো,

‘তুলি, চুলটা বাধো। মেঝে একদম ভিজিয়ে দিয়েছো, দেখো।’

তুলি পেছনে ফিরলো। শুভ্র কথা বলতে বলতে এগুলো,

‘চুল আগে বেঁধে পানি ঝরাও, দেন খুলে ঝাড়বে। এভাবে চুল ঝাড়লে
হেয়ার ড্যামেজ হতে পা— অ্যা’

এক চিৎকার দিয়ে শুভ্র ভিজে মেঝেতে পা পিছলে সোজা তুলির গায়ের উপর পরলো। এভাবে গায়ে পরায় তুলি শুভ্রর ভার সহ্য করতে না পেরে সোজা গিয়ে পরলো বিছানার উপর।হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে শুভ্রর হাত পেঁচিয়ে ধরলো তুলির মেদহীন কোমড়, ঠোঁট ছুয়ে গেল একদম তুলির গলার নিচের অংশে। জীবনের প্রথম এমন স্পর্শে তুলি একপ্রকার থমকে গেল। শুভ্রও সঙ্গেসঙ্গে মুখ তুলল তুলির গলা থেকে। হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটা উল্টো স্রোতে ঘুরে গেল গেল এ নতুন দম্পত্তির।

#চলবে..............



#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৪

হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে শুভ্রর দুহাত পেঁচিয়ে ধরলো তুলির মেদহীন কোমড়, ঠোঁট ছুয়ে গেল একদম তুলির গলার নিচের অংশে। জীবনের প্রথম এমন স্পর্শে তুলি একপ্রকার থমকে গেল। শুভ্রও সঙ্গেসঙ্গে মুখ তুলল তুলির গলা থেকে। হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটা উল্টো স্রোতে ঘুরে গেল গেল এ নতুন দম্পত্তির।

শুভ্রর সমস্ত ভার তুলির উপড় পড়তেই একপ্রকার চ্যাপ্টা হয়ে গেলো তুলি। চোখ খিঁচে রেখে, শুভ্রর বুকে দুই হাত চাপতেই শুভ্র চটজলদি তুলির উপর থেকে উঠে পড়লো। তুলির বুক উঠানামা করছে। ভয় পেয়ে গেছে ও। সঙ্গে প্রথমবারের ন্যায় শুভ্রর ঠোঁটের স্পর্শ হৃদয়ে তীব্র আবেশের জন্ম দিচ্ছে। শুভ্র উঠে বসে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে পায়ে পা ঘষতে থাকল। তুলি শুয়ে আছে। এখনো যেন ঠিক হতে পারছে না। তুলির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শুভ্র পেছনে ঘুরল। তুলি শুয়ে আছে দেখে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলো তুলির দিকে, কিন্তু কিছু বললো না। তুলি ছোট ছোট নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, হাত বাড়িয়ে শুভ্রর হাত চেপে ধরে আস্তে করে উঠে বসলো। তারপর দুজনেই চুপচাপ। শুভ্র মেঝের দিকে চেয়ে। তুলিও সেরকমভাবেই বসে আছে। খানিক পর হঠাৎ দুজন একসঙ্গে বলে উঠলো,

‘সরি।’

নিজেরা বলে নিজেরাই অবাক হয়ে গেলো। একে অপরের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। শুভ্র প্রথমে হেসে ফেললো। তুলিও শুভ্রর দেখাদেখি হেসে উঠলো। শুভ্র বললো,

‘সরি বলার দরকার নেই আমাদের কারোরই। ইটস প্রিটি নরমাল বিটুইন আস।’

তুলি হঠাৎ এমন কথা শুনে কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেলো। কপালের ভিজে চুল কানের পেছনে গুঁজতে গুঁজতে বললো,

‘হুম।’

হঠাৎ শুভ্র বিছানার দিকে চাইল।তারপর দ্রুত উঠে দাঁড়াল,

‘তুলি তুমি তো চুলের পানিতে বিছানাও ভিজিয়ে দিয়েছ।’

শুভ্রর কথা শুনে তুলি পেছনে তাকাল। বিছানার একটা অংশ ভিজে গেছে। তুলি দাঁত দিয়ে জিহ্বা কামড়ে বাঁকা চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে তুলির দিকে। তুলি মিনমিন করে বললো,

‘সরি, আসলে আমার চুল ঘন তো তাই-‘

‘এদিকে টাওয়ালটা দাও তো, আমি মুছে দিচ্ছি চুল।’

শুভ্র কথাটা বলে তুলির টাওয়াল দেওয়ার আর অপেক্ষা করলো না। তুলির হাত থেকে টাওয়াল কেড়ে নিয়ে তুলির পেছনে এসে দাঁড়াল। আলগোছে চুল মুছে দিতে থাকল আর তুলিকে শোনাতে লাগলো কিভাবে চুল মোছতে হয় তার হাজারো টিপস। তুলি এসব শুনেনি। শুনবেও না। এভাবে তুলির চুলে দুনিয়া ভেসে যাক। শুভ্র এগিয়ে আসবে, মুছে দিবে তুলির চুল। তুলি ডুবে যাবে তখন আকণ্ঠ!

শুভ্র বেশ যত্নে তুলির চুল মুছে দিল। তারপর টাওয়াল বারান্দায় মেলে এসে দ্রুত নিজের গায়ে জ্যাকেট জড়াতে জড়াতে বললো,

‘দ্রুত চলো, নাহলে রাতে আর কারোরই খাবার জুটবে না কপালে, হোটেল বন্ধ হয়ে যাবে।’

তুলি এত তাড়া পেয়ে দৌড়ে দৌড়ে ভিজে চুলই আলগা করে খোঁপা করে মাথায় ওড়না তুলে নিলো। শুভ্র তুলিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম লক করে। বাহিরে বাকিরা অপেক্ষা করছিলো শুভ্রদের জন্যে। ওরা যেতেই তারা সবাই চলল রাতের খাবারের উদ্দেশ্যে।

খাবার খেয়ে রুমে আসল দুজন তখন প্রায় ১১টা। খাবার খাওয়া অনেক আগেই শেষ হয়েছিল, তবে সবাই মিলে প্রায় এক ঘণ্টার মতো রাতের সাজেকের রাস্তায় হাঁটছিল, তাই এত দেরি হওয়া। সারাদিন জার্নি করে রাতে বিছানায় এসেই দুজন ক্লান্ত দেহে কয়েক মিনিটেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো।
_____________________
ভোর হয়নি এখনো। সূর্য উদিত হবে আর অল্পক্ষণের মধ্যেই। সাজেকের সকল সৌন্দর্যের মধ্যে প্রধান হচ্ছে, ভোরের সূর্যোদয় দেখা। সূর্য মেঘের উপরে ভেসে বেড়ায় অনেকটা তেমন মনে হয়। শুভ্র অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিল। ৪টা বাজতেই অ্যালার্ম এর শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। বুকের উপর কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে, ঘুমে ডুবে থাকা চোখ ঘুরিয়ে পাশে চায়। তুলি ডান হাত দিয়ে শুভ্রকে জড়িয়ে রেখেছে। ঘুমে কাহিল তুলি হয়তো বুঝেও নি, সে কী করছে। শুভ্র মৃদু হাসলো। হাতটা আলগোছে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় রাখলো খুব যত্ন নিয়ে।

শোয়া থেকে উঠবে তখন চোখ গেল তুলির ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখের দিকে। ঘুমন্ত অবস্থায় তুলিকে খুব বেশি মায়াবি দেখায়, কথাটা সত্য। এইজে শুভ্র এখন চোখ ফেরাতে পারছে না, ওঠে ব্রাশ করতে যাবে: সেটাও করতে পারছে না। সেই কখন থেকে তুলির দিকে চেয়েই আছে। এইজন্যে বোধহয় বিয়ের আগে ছেলেমেয়ের একসঙ্গে থাকা নিষেধ। তখন এসব খুঁটিনাটি সোন্দর্য বিয়ের আগে একে অপরের নিকট প্রকাশ পেয়ে যায়, বিয়ের আর তখন আগ্রহ থাকে না।

তুলির এলোমেলো চুল কপালের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুভ্রর কী হলো কে জানে। এগিয়ে আসলো সে। তুলির উপর শুয়ে ঝুঁকে এলো তুলির ঘুমন্ত মুখের দিকে। কপালের চুল চার আঙুলে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে মুখের দিকে চাইল তীব্র দৃষ্টিতে। তুলির নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পারছে শুভ্র।
আল্লাহ বোধহয় এজন্যে বিয়েকে হালাল করেছেন। দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ কিভাবে একটু একটু করে বিয়ের দোহাই দিয়ে কাছে আসছে, শুভ্র তুলি তারই নমুনা। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ চেয়ে থাকার পর কী মনে করে আচমকাই শুভ্র ঠোঁট বসালো তুলির কপালের ত্বকে। তুলির নিঃশ্বাসের শব্দ আরও নিবিড় হলো যেন। শুভ্র কপালে ঠোঁট বসিয়েই বিড়বিড় করলো,

-‘আলহামদুলিল্লাহ! আমার জীবনে তোমার আসার দরকার ছিলো, এভাবে নাহলে অন্যভাবে।’-

তুলির ঘুম পাতলা হচ্ছে দেখে শুভ্র নিজেকে ঠিক করে চট করে উঠে গেল বিছানা থেকে। শুভ্র বাথরুমে যেতেই চোখ খুলে তাকাল তুলি। চোখ তার টলমল করছে। শুভ্র তাকে ভালোবেসে স্পর্শ করেছে, উফ! তুলি আলগোছে বা হাত তুলে শুভ্রর স্পর্শ করা কপালের সেই অংশ ছুলো তুলি। মনেহচ্ছে, এখনো শুভ্রর ঠোঁট ছুয়ে আছে তুলির কপাল। কোথাও শুনেছিলো, যে পুরুষ তোমাকে মন থেকে চাইবে- তার ঠোঁটের স্পর্শ তোমার কপাল ছুবে সবার প্রথমে। তার চুমুতে তুমি শান্তি পাবে, আরাম বোধ করবে। এইজন্যেই বোধহয় শুভ্রর ছোয়া এখনও তুলির মনে গেঁথেই রইলো। তুলির শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। শুভ্র তাকে মেনে নিচ্ছে, একটু একটু করে দুজন এগিয়ে যাচ্ছে একটি সুখী সংসারের দিকে। ব্যাপারটা ভেবেই তুলি রোমাঞ্চকর অনুভব করছে।

শুভ্র বাথরুম থেকে বেরুতেই তুলি আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভান করল। নাহলে দেখা যাবে লজ্জায় শুভ্র তুলির মুখোমুখিই আর হচ্ছে না। শুভ্র ব্রাশ করে এসেছে। সূর্য উঠবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। আকাশে লালচে আভা দেখা যাচ্ছে। শুভ্র আর দেরি করলো না। এগিয়ে এসে তুলির মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। ডাক দিলো তুলিকে,

‘তুলি, তুলি। উঠবে একটু? একটা বেস্ট জিনিস দেখাবো তোমাকে। প্লিজ উঠো। তুলি? দেরি করলে কিম্তু মিস হয়ে যাবে। আফসোস করলেও লাভ হবে না তখন। শুনছো, তুলি।’

তুলি এত ডাক শুনে আড়মোড় ভাঙার ভান করে তাকাল শুভ্রর দিকে। কিছুক্ষণ শুভ্রর দিকে ঘুমঘুম চোখে চেয়ে রইলো, তারপর হালকা করে হাসল। সঙ্গেসঙ্গে শুভ্রর মনেহলো,, সে তার হার্টবিট মিস করেছে। ঘুমন্ত মুখে এমনিতেই আজ সকালে তুলির উপর ঘায়েল হয়েছে সে। আর এখন ঘুমঘুম মুখে মুচকি হাসি। উফ, মারাত্মক! শুভ্র ড্যাবড্যাব করে তুলির দিকে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ। তুলি হাসি থামিয়ে উঠে বসলে শুভ্রর হুশ ফেরে। সঙ্গেসঙ্গে কোমরে হাত রেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরালো। তুলি চুল খোপা করতে করতে উঠে বসল। ঘুমঘুম গলায় জিজ্ঞেস করলো,

‘কী দেখাবেন, দ্রুত দেখান। আমি ঘুমাব।’

শুভ্র স্বাভাবিক হলো এবার। এগিয়ে এসে তুলির কাঁধ ধরে জোর করে তুলিকে উঠাল। বারান্দার দিকে তুলিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো,

‘নো ওয়ে। ঘুমকে এখন না বলো প্লিজ। আমরা একটা বেস্ট জিনিস দেখবো একসঙ্গে। কাম উইদ মি।’

তুলিকে বারান্দায় এনে থামাল শুভ্র। তুলি ঘুম চোখ মুছে সামনে তাকালো। পুরো সাজেকের আকাশ লালচে হয়ে আছে। দু কদম এগিয়ে এসে কাঠের বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়াল তুলি। সূর্য উঠছে একটি একটু করে। তুলি হা হয়ে চেয়ে আছে সামনে। শুভ্রও মৃদু হেসে তুলির পাশে গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়াল। সূর্য উদয় হচ্ছে যেন মেঘের উপর থেকে। সাদা মেঘ ভাসছে, তার উপর লাল টকটকে এক সূর্য। ভয়াবহ সুম্দর দৃশ্য। তুলি খুশিতে নেচে উঠল যেন,

‘ওয়াও! কি সুন্দর সূর্য।’

শুভ্র তুলির মতো সামনে চেয়ে আছে। শুভ্র মন্ত্রমগ্ধের মতো বললো,

‘ইয়াহ! সাজেকের অন্যতম সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে এটা একটা।’

‘সত্যিই সুন্দর।’

সূর্য উঠে গেছে অনেকক্ষণ। তুলি শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে এখনো বারান্দার গ্রিল ঘেষে। দুজনেই চুপ। ভোরের শীতল বাতাস বইছে। তুলির গায়ের শাল সে বাতাসে মৃদুমন্দ উড়ছে। তুলি শালটা নিজের গায়ের সঙ্গে চেপে রাখলো। ওর হাত রেলিংয়ের উপর রাখা। শুভ্রও হাত উঠিয়ে তুলির পাশে রেলিংয়ে রাখলো। একটাসময় শুভ্র সূর্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে মুগ্ধ তুলির দিকে একবার তাকাল। তারপর তাকাল তুলির হাতের দিকে। ঢোক গিলে শুভ্র। কী করবে, হাতটা কী ছুবে? ছুলে কী তুলি অস্বস্তি বোধ করবে? শুভ্র সাতপাচ চিন্তা করেও নিজেকে এটুকু দমাতে পারল না। হাত একটু একটু করে এগুলো তুলির হাতের দিকে। প্রথমে আঙুলে আঙুল ছুয়ে গেলো। তুলির ধ্যান ভাঙল। কিম্তু তাকাল না শুভ্রর দিকে। অপেক্ষা করলো যেনো আরো একটুখানি স্পর্শের। শুভ্রও সামনে তাকিয়ে একটু একটু করে পুরো হাতটাই নিজের হাতের মধ্যে পুড়ে নিলো।

হাতটা সম্পূর্ণ শুভ্রর দখলে চলে গেলো, তখন তুলি তাকাল শুভ্রর দিকে। শুভ্রও কেমন সম্মোহিত দৃষ্টিতে তাকাল। তুলি তাকিয়ে আছে দেখে শুভ্র তুলির সম্মতি নেই সেটা ভেবে সঙ্গেসঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিতে গেলে- তুলি ছাড়ল না। বরং ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন শক্ত করে শুভ্রর হাত চেপে ধরলো। দুজন দুজনের দিকে চেয়ে সামান্য হাসলো। তারপর আবার দুজন সামনে তাকাল আবার। একে অপরের হাতে হাত রেখে দুজন অনুভব করল তাদের জীবনের এক নতুন সূর্যোদয়!

#চলবে.............



#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৫

তুলি দিনদিন বুঝতে পারছে, শুভ্র তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তুলি নিজেও ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুভ্রর প্রতি। শুভ্রর কথা বলার ধরন, বাচনভঙ্গিমা, ভ্রু নাচানো, দায়িত্ববোধ, তুলির প্রতি স্ত্রী হিসেবে এক আলাদা সম্মান এ সবকিছুই তুলিকে তীব্রভাবে শুভ্রর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।তুলি আয়নার সামনে দাঁড়ানো। আজ সন্ধ্যায় ছোটখাটো বারবিকিউ পার্টি আয়োজন করেছে সবাই মিলে। তুলি বাসা থেকে আসার সময় কোন শাড়ি আনেনি। কিম্তু এখন শুনছে পার্টিতে নাকি সবাই শাড়ি পরবে।এটা শুনে, কোথা থেকে শাড়ি জোগাড় করে তুলির হাতে ধরিয়ে দিল শুভ্র। তুলি সেই শাড়িটাই পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এসব সাতপাঁচ চিন্তা করছে। তুলি অপেক্ষা করছে, শুভ্র কখন; ঠিক আর কতদিন পর নিজের অনুভূতি কনফেস করবে। তুলি মেয়ে, চাইলেও আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে পারছে না। তাছাড়া তাদের সম্পর্কটা আলাদা ছিলো শুরুতে। সেটাও একটা বাঁধা বলা চলে। তাই তুলি এখানে নীরব। করুক নাহয় আরও অপেক্ষা, তার লজ্জা ভাঙলেই হয়।

তুলি প্রায় তৈরি। শুভ্র কল এলো তখনি। তুলি কল ধরলো। ওপাশে শুভ্র ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানতে চাইল,

‘তৈরি তুমি?’
‘হু।’
‘নিচে আসো, আমরা এখানেই আছি। একা আসতে পারবা তো?’
‘পারবো, চিন্তা নেই।’
‘তাহলে আসো। রাখছি।’

শুভ্র কল কাটল। তুলি শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। ভালোই দেখাচ্ছে তাকে। তুলি শরীরে ভালো করে আঁচল জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।

নিচে এসে দেখে শুভ্র আর তার বন্ধুরা মিলে কয়লা পুড়িয়ে বারবিকিউ বানাচ্ছে। তুলি শুভ্রকে দেখলো। কালো রঙের শার্টের হাতা ফোল্ড করা কনুই অব্দি, সামনের দুটি বোতাম খুলে কলার ছেড়ে দেওয়া। ডান হাতে কয়লা লেগে আছে, কপালেও কয়লার ছিটে।তবে তাতেও কী ভয়াবহ সুন্দর দেখাচ্ছিল তখন শুভ্রকে। তুলির তখন মনে হয়েছে, সে এই প্রথমবারের মতো শুভ্রর উপর ক্রাশ খেয়েছে। তুলি হা করে শুভ্রকে দেখছিল। হঠাৎ পাশ থেকে মহু শুভ্রর দিকে চেয়ে চেঁচাল,

‘শুভ্র, ভাই বউ এসেছে তোমার, বউয়ের দিকে একটু মন দাও। মেয়েটা সে কখন থেকে তোমার দিকে চেয়ে আছে। পাগল করে দিয়েছ দেখি একদম তুলিকে।’

কোথাটা শোনামাত্রই তুলি চোখ সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেলো। লজ্জায় মনে হচ্ছে ও গলা অব্দি ডুবে যাচ্ছে।এভাবেও কেউ সবার সামনে বলে? ইস! শুভ্র ভ্রু নাড়িয়ে তুলির দিকে মৃদ্যু হেসে তাকাল। লজ্জা পাচ্ছে তুলি বুঝতে পারল শুভ্র। তাই হাতের কাজ ফারহানকে ধরিয়ে দিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে আসলো তুলির দিকে।

শুভ্র এগুচ্ছে দেখে তুলি শাড়ির আঁচল খামছে ধরে অন্যদিকে ফিরল। শুভ্র পেছনে এসে দাড়ালো। পেছন থেকেই বললো;

‘কী ব্যাপার? আমাকেই দেখছিলে নাকি এতোক্ষণ, মিস ছাত্রি।’

তুলি লাজুক হাসল। পরপর নিজেকে সামলে শুভ্রর দিকে ফিরে বেশ ভাব নিয়ে বলল;

‘উহু, আমি আপনাদের রান্না করা দেখছিলাম।’

কথাটা বলে আবার মুখ টিপে হেসে অন্যদিকে মুখ ঘুরালো তুলি। শুভ্র তুলির থুতনি চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরাল। ভ্রূ নাচাল,

‘আর ইউ শিউর’

তুলি দ্রুত উপরে-নিচে মাথা নাড়লো।

‘উঁ।’

শুভ্র হেসে ফেলল। তুলির মুখটা ছেড়ে দিয়ে বললো,

‘আচ্ছা বাদ দাও। ক্ষুধা পেয়েছে?’

তুলি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলো। মৃদু আওয়াজে বললো,

‘এখন অব্দি না।’

শুভ্রও বাম হাতের কব্জি জড়িয়ে থাকা ঘড়ি দেখল। টাইম দেখে নিয়ে বললো;

‘একটু অপেক্ষা কর। ঘণ্টাখানেকে মধ্যে খাবার রেডি হয়ে যাবে আই থিঙ্ক।তুমি মহুদের পাশে গিয়ে গল্প করো। আমি রান্নাতে যাচ্ছি।’

তুলি প্রশ্ন করলো;

‘আমি হেল্প করবো?’

শুভ্র বিস্মিত হলো। পরপর সামান্য হাসলো। তুলির কপালে দু আঙুলে টোকা দিয়ে বললো,

‘আজ্ঞে না। রান্নার জন্যে পুরো জীবন পরে আছে। এই রান্নাটুকু আমাকেই করতে দিন।আপাতত যান গল্প করুন গিয়ে।’

তুলি এভাবে আপনি-আপনি করে শুভ্রর ঠাট্টা করায় হেসে ফেলল। শুভ্রকে পাশ কাটিয়ে দু কদম সামনে যেতেই পেছন থেকে শুভ্র ডাকল,

‘তুলি?’

শুভ্র যখন এভাবে ডাকে, তুলির বোধ হয় হাজারো ফুলঝুরি তুলির কানের কাছে ঝমঝমিয়ে উঠে। তুলি পেছন ফিরে চাইলো। শুভ্র প্রথমে হালকা করে হাসল। তারপর মাথা চুলকে এগিয়ে তুলির মুখোমুখি দাঁড়ালো। তুলি ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করল,

‘কী, কিছু বলবেন?’

শুভ্র গরিমসি করল খানিক। কিছু বলবে বলবে করেও মুখ ফুটে বেরুচ্ছে না। তুলি অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রর কথা শুনবে বলে। শুভ্র গলা খাকারি দিল। তারপর হাতে লেগে থাকা কয়লা আঙুলের ডগায় নিয়ে তুলির কানের পেছন লাগিয়ে দিয়ে বললো,

‘সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়।’

ইস, এভাবেও কেউ বলে? শুভ্র কী জানে, তুলির বুকে ঝড় উঠে এভাবে কথা বললে।মনে হয়, মনে হয় তুলি হারিয়েই জাচ্ছে অতলে, গভীরে। তুলির কথাটা কী যে ভালো লাগল। কানে হালকা করে হাত ছুঁইয়ে তুলি ফিসফিস করে বললো,

‘থ্যাঙ্ক ইউ।’

শুভ্র উত্তরে সামান্য হাসল। তারপর বলল;

‘নেক্সট টাইম থেকে কাজল পড়ো, আমি তখন কয়লার বদলে নজরফোঁটায় কাজল দিয়ে দিব, হবে?’’

কী দুর্দান্ত আবদার! তুলি মৃদু হাসল। তারপর বললো,

‘ঠিকাছে।’

শুভ্র তুলিকে মহুদের পাশে বসিয়ে রান্নায় চলে গেলো। মহু এবং দিয়া গল্প করছে। পাশে তুলি তাদের গল্প শুনছে। গল্প শুনছে বললে ভুল হবে, সে ঘুরেফিরে বারবার শুভ্রকে দেখছে। শেফ শুভ্রকে দেখতে তুলির চমৎকার লাগছে। বারবার মনে পড়ছে, কিভাবে শুভ্র কয়লায় ফোঁটা তুলির কানের পেছনে ছুয়ে দিয়ে নজরবন্দি করে রাখল। তুলির তখন বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো, আপনি কালো শার্টে এভাবে আমার পাশে দাঁড়ান। আজ সকালের মতো এভাবে আমার হাতটা একটু একটু করে ছুয়ে ফেলুন। হয়ে যান আপনিই আমার নজরফোঁটা। কয়লা বা কাজল কিচ্ছু লাগবে না। যদি আমার পাশে আপনি এভাবে দাঁড়ান, দুনিয়ার কেউ,কোন কিছু আমায় নজর দিতে পারবে না, আপনি কী সেটা জানেন? তবে তুলি বলতে পারেনি, লজ্জায়!
_____
খাওয়া-দাওয়া সময় এলো। আজ পুরুষরা মহিলাদের খাবার সার্ভ করল। শুভ্র তুলির প্লেটে চিকেন বারবিকিউ তুলে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,

‘ভালো করে খেও, এত শুকনা হলে চলে?’

তুলি শুনে মাথা তুলে শুভ্রর দিকে তাকাল। ইয়াসমিনও এভাবে তুলির প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে একই কথা বলেন। শুভ্র মৃদু হেসে ইশারা করল,

‘খাও।’

বলে চলে গেলো অন্যপাশে। তুলি হালকা হেসে খেতে মন দিল। পাশ থেকে মহু বললো,

‘এত কেয়ারিং শুভ্রকে আমি এই প্রথম দেখলাম তুলি। তুমি আসায় আজকাল ওকে অনেক খুশি দেখাচ্ছে। আই থিঙ্ক হি লাভস ইউ! ছাত্রী স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা জন্মাচ্ছে বেচারার।’

তুলি লজ্জা পেয়ে হেসে উঠলো। তারপর খেতে খেতে বললো,

‘বুঝি আমি।’
‘ভালোবাসে?’
‘হু।’
‘কনফেস করেছো দুজন?’
‘এখনো না।’

মহু অবাক হলো। প্রশ্ন করলো;

‘কিম্তু কেন? তোমাদের উচিত কনফেস করা একে অন্যকে। শুভ্রর অবশ্য এতে এগিয়ে আসা উচিত।’

তুলি এইবার কথা বললো না। শুধু হাসল। মহু বললো,

‘তুমি কী অপেক্ষা করছ শুভ্রর কনফেসের? আমি হেল্প করবো?’

তুলি এইবারও উত্তর দিলো না। শুধু লাজুক হাসলো।কী বলবে সে? নিজ মুখে স্বীকার করবে কিভাবে? কিম্তু সেও তো তাই চায়। শুভ্র এগিয়ে আসুক আগে, তুলি তখন ঝাপটে ধরবে তাকে। মহু যা বোঝার বুঝে গেলো। তারপর কানেকানে তুলিকে শুনিয়ে দিল কয়েক কথা। তুলি শুনল, তারপর হা করে শুভ্রর দিকে চেয়ে আবার মহুর দিকে তাকাল। বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল,

‘আমার এসব করাই লাগবে?’
‘ইয়েস,করা লাগবে। শুভ্রকে বাঘে আনতে অবশ্যই করা লাগবে। ও যা চাপা ছেলে, সহজে ধরা দিবে না। দেখো গিয়ে, ভালোবেসেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে বেচারা। ইস, শুভ্রর ওয়ান থার্ড লজ্জাও যদি আরিফের মধ্যে থাকত। জীবন ধন্য হয়ে যেত! বাট তোমার জীবন ধন্য তুলি।বাকি ধন্য করতে তোমাকে এটা করতে হবে। ইউ গট ইট?’

তুলি শুনল। তারপর কিছু একটা ভাবলো। শুভ্রর দিকে আবারও চাইলো। দূর থেকে শুভ্র তুলির তাকানো দেখে ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জানতে চাইল; কী? তুলি না বোধক মাথা নাড়লো। শুভ্র হালকা হেসে আবার খাওয়ায় মন দিল। তুলি নিজের ভাবনায় ডুবে চুপচাপ থাকল বাকিটাক্ষণ।

#চলবে...........


#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৬

রাতের আকাশের নিচে সবাই মাদুর পেতে বসে আছে। তুলি প্রথমে শাড়ির আঁচল কোলে রেখে বসে ছিলো। কিম্তু তারপর হঠাৎ শুভ্র সবার অগোচরে আঁচলখানা নিজের হাতে পেঁচিয়ে হাতটা লুকিয়ে নিজের প্রশস্ত পিঠের পেছনে রেখে ভদ্র মুখ করে সবার সঙ্গে গল্প করতে লাগলো। তুলি হতভম্ব; শুভ্র স্যার লাজুক কিম্তু যথাযথ সভ্যও নন। কথাটা তুলি কেন যেন সাজেক আসার পর বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
সবাই এইফাঁকে গান ধরেছে। শুভ্রও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গুনগুন করছে। তুলি মুগ্ধ হয়ে শুনছে শুভ্রর হালকা আওয়াজের গান। তুলি শুভ্রকে এতোক্ষণ ধরে দেখছে, সেটা কিভাবে যেন তুলির দিকে না চেয়ে শুভ্র বুঝে ফেললো। তাই শুভ্র গান থামিয়ে তুলির দিকে তাকাল; ভ্রু নাড়িয়ে প্রশ্ন করল,

‘কী দেখছ মিস ছাত্রী?’
‘নাথিং।’

কথাটা বলে লজ্জায় তুলি মুখ সরালো অন্যপাশে। শুভ্র মাথা নিচু করে হালকা হাসল। পরপর হাতে পেঁচানো শাড়ির আঁচলে টান দিলো।যেন তুলিকে ডাকছে। তুলি তাকাল আবার। শুভ্র বললো,

‘তুমি কী কিছু লুকাচ্ছো আমার থেকে?’

তুলি চোখ বড়বড় করে তাকালো।শুভ্র কী কিছু বুঝতে পারছে? কিভাবে পারলো? তুলি তো এখন অব্দি কোনো কিছু বুঝায় নি; স্বাভাবিক থেকেছে বরং। তারপরেও? তুলি পরপর দ্রুত মাথা নেড়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো,

‘উহু? কেনো বললেন এ কথা?’

শুভ্র কাঁধ নাচিয়ে গা-ছাড়া ভাবে বলল,

‘এমনি , লাগল আমার কাছে।’
‘ওহ।’

তুলি স্বস্তির শ্বাস ফেললো। শুভ্র বাকিটাক্ষণ সবার অগোচরে এভাবেই তুলির শাড়ির আঁচল হাতের আঙুলে পেঁচিয়ে বসে থাকলো। তুলিও তেমন কথা বললো না। রাত হতেই যে যার ঘরে ফিরলো।
________
সকালের হুট করে খেতে বেরুতেই মহুয়ার ইচ্ছে হলো দূরে কোথাও নাস্তা করতে যাবে। আরিফ তো সেটা শুনে খুব রেগে গেলো। বললো,

‘দূরে যাবে মানে? তোমার শরীর দেখেছো? চারদিনেই শরীরের অবস্থা কাহিল বানিয়ে দিয়েছো। নিজেও জেদ দেখাচ্ছো, আর আমার বাচ্চাটাকেও কষ্ট দিচ্ছো।’

মহু মুখ ফুলো করে আরিফের দিকে তাকাল। ত্যারাভাবে বললো,

‘তোমার বাচ্চা মানে? ও আমার কেউ না? আর আমি যাবো খেতে, আমি যাবোই। দরকার হলে একা যাব। কারোর দরকার নেই আমার।’

মহু ব্যাগ নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে একা একাই বেরিয়ে যাচ্ছিলো। আরিফ থামালো না। রাগে ফুশফুশ নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে মহুর যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকলো। দুজনের বাকবিতণ্ডা দেখে শুভ্র বলল,

‘কেন মহুকে রাগাচ্ছিস? চল যাই।ও একা যাবে এই অবস্থায়? তুইও না।’

আরিফ বিরক্ত হয়ে বললো,

‘তুই দেখেছিস ওর অবস্থা? কাল সারারাত ওসব কয়লা পোড়া খাবার খেয়ে বমি করেছে। দুবার পেটের ব্যথায় ঘুমও ভেঙেছে। অ্যাহ, উনি নাকি ডাক্তার। ডাক্তার হলে কেউ এমন করে। রাগ লাগছে ইয়ার।’

শুভ্র ভ্রু বাকালো,

‘মহুর উপর?’

আরিফ বাঁকা চোখে দূরে মহুর হাঁটার দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

‘উহু, নিজের উপর। ওকে এখানে নিয়েই আসা উচিত হয়নি আমার।’

শুভ্র হেসে ফেললো। বললো,

‘আটকা ওকে। চলে যাচ্ছে। একা গেলে বিপদ, আমরা সাথে থাকলে সেইফ থাকবে।’

আরিফ শুভ্রর দিকে একবার তাকাল, তারপর মহুর দিকে চেয়ে প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ছাড়ল। পরপরই ছুটলো মহুর পেছনে। দুজন দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মহু ঝগড়া করছে, আরিফ মানাচ্ছে। দৃশ্যটা চোখে পড়ার মতো। তুলির ভালো লাগা বাড়লো। বিড়াল ছানার ন্যায় গা ঘেঁষে দাঁড়াল শুভ্রর। ওদের দিকে চেয়ে শুভ্রর উদ্দেশ্যে বললো,

‘দে মেইড ফর ইচ আদার। হোয়াট অ্যা পারফেক্ট কাপল!’

শুভ্র হালকা হাসলো। তুলির ন্যায় ওদের দিকে চেয়ে দেখল। তারপর তুলির দিকে চেয়ে সম্মোহনী স্বরে বললো,

‘লাইক আস?’

প্রশ্ন করল শুভ্র। তুলি শুভ্রর দিকে তাকাল। হয়তো তুলি আশা করেনি শুভ্র এ কথা বলবে। তুলি কিছুক্ষণ শুভ্রর দিকে চেয়ে রইল। তারপর হেসে ফেলল। চোখ ছোটছোট করে পাল্টা প্রশ্ন করলো;

‘আর ওই অ্যা পারফেক্ট কাপল?’

শুভ্র এমন চোখা প্রশ্নে কিছুটা মিইয়ে গেলো। মাথা চুলকে অপ্রস্তুত হয়ে বললো,

‘মানে ওই আর ট্রায়িং, রাইট?’

তুলি শুভ্রর উত্তর দেওয়ার ধরন শুনে এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। শুভ্র মুগ্ধ হয়ে সেই হাসি দেখলো। হাজারো হাসি দেখেছে সে। কিন্তু ওমন সুন্দর হাসি শুভ্র কখনও দেখেনি। শুভ্র মাথা চুলকে তুলির হাসি দেখেই গেলো অবিরাম।

মহুর কথাই শেষ অব্দি রাখা হলো। সবাই অনেকটা দূরে একটা ছোটখাটো মাচার রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছে। মহু এই রেস্টুরেন্টের বেশ নাম শুনেছে। তাই নিজে বেছে বেছে সব ভালো, মজাদার খাবার অর্ডার করলো। সবাই খাবারের জন্যে অপেক্ষা করছে। মহু এইফাকে তুলিকে মেসেজ করলো,

‘তাহলে শুরু করা যাক? ও পৌঁছে গেছে।’

তুলি মেসেজটা পড়ে শুভ্রর দিকে একবার তাকাল। মহু বুঝতে পারল; তুলি কিছুটা অস্বস্তিতে ভুগছে। মহু আবারই মেসেজ করল,

‘রেডি তো, তুলি?’

তুলি হাফ ছাড়ল। তাকে এটা করতেই হবে। হোক না একটু ছেলেমানুষী। কিন্তু লাজুক শুভ্রর লজ্জা ভাঙতে এটা করাই লাগবে। তুলি ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে মেসেজ লিখল,

‘ইয়াহ, আ’ম রেডি ম্যাডাম।’

তুলির মেসেজটা পড়ার পর মহু ‘থাম্বসআপ’ দেখালো তুলিকে। পরপরও ইশারা করল কাউকে। তারপর রেস্টুরেন্টে ঢুকল একজন ইয়াং, সুদর্শন ফর্মাল গেটআপে এক পুরুষ। তুলি তাকে একবার দেখল। শুভ্রর এসবে মনোযোগ নেই। সে বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মশগুল।

মহু মেসেজ করল তুলিকে,

‘সে এবার তোমার সামনে বসবে। একটিং শুরু করো। উলটাপাল্টা করবে না কিছু, চিন্তা নেই। হি ইজ ম্যাই ফ্রেন্ড, এন্ড ম্যারেড।’

তুলি এবার আশ্বস্ত হলো। ছেলেটা সোজা এসে তুলির ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসল। মহু তাকে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে চেঁচালো,

‘সুভম, তুই এখানে? এই সাজেকে? হোয়াট অ্যা কোইনসিডেন্ট।’

সুভম তুলির দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখল। তারপর মহুর উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

‘এই আরকি ঘুরতে এলাম। তা,কেমন আছিস?’
‘প্রেগন্যান্ট অবস্থায় যতুটুকু ভালো থাকা যায়!’

মহু হ্যান্ডশেক করল। মহু সবার সঙ্গে পরিচিয় করিয়ে দিল সুভমকে। সুভম সবার সঙ্গেই হ্যান্ডশেক করল। কিন্তু তুলির সঙ্গে হ্যান্ডসেক করার সময় তুলির দিকে নির্নিমেষ চেয়ে রইল। এতোক্ষণ পুরো ব্যাপারটা আমলে না নিলেও এবড় শুভ্রর খুব গায়ে লাগল। শুভ্র ত্যারা চোখে দুজনের হ্যান্ডসেক করা হাতের দিকে চেয়ে রইলো। সুভম চেয়ারে বসল।সুভমকে দেখে মহু সুভমের জন্যঅ খাবার অর্ডার দিল। সুভম সবার সঙ্গে গল্প করছে। কিন্তু ঘুরেফিরে তার নজরে তুলির দিকে যাচ্ছে বারবার। ব্যাপারটা শুভ্র তীক্ষ চোখে দেখে যাচ্ছে। মহু তুলির পরিচয় দেবার সময় তুলিকে শুভ্রর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। দিয়েছে আরিফের ছাত্রী হিসেবে। তাই হয়তো সুভম তুলির ব্যাপারে পজিটিভ কিছু চিন্তা করছে। শুভ্রর এই শুভমকে মোটেও ভালো লাগছে না। একবার শুভ্র তুলির হাত চেপে ধরল টেবিলের নিচে। তুলি শুভমের সাথে মন খুলে গল্প করছিল। পাশে যে শুভ্র আছে সেটা যেন সে ভুলেই বসেছে। শুভ্র হাতটা চেপে ধরলে তুলির গল্পে বিঘ্ন ঘটে। সে প্রশ্নবোধক চোখে শুভ্রর দিকে চায়। শুভ্র ফিসফিস করে বললও;

‘তুলি? সুভমের সঙ্গে তোমার এত কথা আমার পছন্দ হচ্ছে না কিম্তু।’

তুলি উত্তরে কিছু বলবে তার আগেই শুভম তুলিকে প্রশ্ন করে বসল,

‘তুলি, তোমার ঘরে কে কে আছে?’

তুলি আর শুভ্রর কথায় ধ্যানই দিলো না। গল্প জুড়ে দিল শুভমের সাথে। শুভ্রর তখন মনে হয়েছিল, সুভমের মাথাটা এই কাচের গ্লাসে একবারে ফা টিয়ে দিতে। সমস্যা কী এই ছেলের? তার বউকে নিয়ে এতো জানার ইচ্ছে শুভমের কেন থাকবে? রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে শুভ্রর। শুভ্র তুলিকে সাবধান করবে তার আগেই সবার খাবার টেবিলে চলে এলো। শুভ্র তাই থেমে গেলো। খাবার খাওয়া সময়ই সুভম একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলো তুলিকে। তুলিও বেশ হাসিখুশি উত্তর দিচ্ছে। শুভ্র মনেমনে রেগেমেগে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। খাবারটাই ঠিকঠাক গলা দিয়ে নামছে না। বারবার পানি গিলছে।

খাবার খাওয়া শেষ হলে সুভম আগ বাড়িয়ে সবার বিল দিয়ে দিলো।সবাই এতে শুভমের কী যে গুণগান গাইতে লাগলো। বিল পে করে সুভম তুলির দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললো,

‘আমার পক্ষ হতে তোমাকে ট্রিট। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগলো। আই হোপ, আমাদের আবার দেখা হোক।’

তুলি শুভ্রর দিকে তাকলো। শুভ্র বাঁকা চোখে তুলির দিকে চেয়ে আছে। যেন এক্ষুনি সুভম এবং তুলিকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে আর ঢেঁকুরও তুলবে না। তুলি শুভ্রর এই চাওনি দেখে ভয়ে সেটিয়ে গেল। মহুর আইডিয়া না জানি তুলির নিজের উপর ভারি হয়ে যায়। টুলি শুকনো হেসে শুভমকে উত্তরে বলল,

‘থ্যাঙ্ক ইউ। ঢাকা গেলে অবশ্যই দেখা হবে।’

‘তোমাদের বাসা কোথায়, তুলি ? একচুয়ালি আমি আমার বাবা মাকে পাঠাতে চাইছিলাম।’

তুলি এবার শুভ্রর দিকে তাকাল। অ্যাক্টিং এবার এক্সট্রিম পর্যায়ে যাচ্ছে। শুভ্র ধীরে ধীরে বো ম হয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় ফে টে যেতে পারে। শুভ্র বুঝতে পারছ কথাগুলো কোথায় গড়াচ্ছে। শুভ্র এগিয়ে এসে এদের কথা থামাবে তার আগেই সুভম বলে বসল,

‘আই থিঙ্ক আই লাইক ইউ। আমিও ডাক্তার, তুমি ডাক্তার হবে। আই থিঙ্ক আমাদের খুব জমবে। ইফ ইউ এগ্রি, দেন আমি আমার বাবা-মাকে দিয়ে তোমার বাসায় প্রস্তাব পাঠাব। তোমার বাসার ঠিকানা বলা যাবে প্লিজ?’

কথাটা শুনে তুলি চোখ বড়বড় করে শুভ্রর দিকে তাকাল। ব্যাস, হয়ে গেছে। শুভ্র থমকে গেলো। কয়লার মতো অঙ্গার হয়ে সুভমের দিকে চেয়ে থেকে তারপর তেড়ে এসে তুলির হাত টেনে ধরলো। শুভমের দিকে চেয়ে হাসার চেষ্টা করে বললো,

‘এক্সকিউজ মি। আই নিড হার। ক্যান ওই গো? থ্যাংক উ।’

শুভ্র কথাটা বলে সুভমের কিছু বলার অপেক্ষা করলো না আর। তুলিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল হোটেলের দিকে। সুভম মৃদু হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে বললো,

‘ইয়াহ, এক্সকিউজ্ড।’

শুভ্র তুলিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই সবাই একসঙ্গে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। মহু শুভমকে বললো,

‘ ব্যাটা, ফা টিয়ে দিয়েছিস। ঘি পুড়ছে খুব।’
___________
শুভ্র দেয়ালে হাত ঠেসে রেখেছে। তুলি ভয়েভয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শুভ্রর চোখের দিকে চেয়ে আছে। আজ রক্ষে নেই বোধহয় তুলির। শুভ্র তুলির দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। তারপর একটু নড়েচরে বললো,

‘ইফ ইউ ফরগেট, বাই চান্স। লেট মি রিমেইন্ড ইউ, ইউ আর ম্যারেড। আরেন্ট ইউ?’

তুলি দুদিকে মাথা নাড়লো। বোঝাল, সে ভুলেনি সেটা। শুভ্র এবার রাগ দেখালো। বলল,

‘তো ওই ডাক্তার তোমাকে কেন বিয়ের জন্যে প্রপোজ করবে? হুয়াই?’

তুলি শুনল। সে তো মহুর কথায় এসব করেছে। তুলি আগেপিছে ভাবলো। তারপর বললো,

‘উনি জানতেন না। তাই-‘
‘কেন জানত না? প্রুভ রাখো নি কেনো তুমি?’
‘প্রুভ? কী প্রুভ রাখবো?’

শুভ্র তুলির ডান হাত নিজের হাতে নিলো। হাতটা উঁচু করে তুলির চোখের সামনে ধরে বললো,

‘চুড়ি কোথায় তোমার? বিবাহিত মেয়ের হাতে চুড়ি থাকবে না কেন?’

তুলি শুভ্রর কথায় কুণ্ঠাবোধ করলো। ইয়াসমিন তাকে অনেকবার চুড়ি পড়তে বলেছেন। এপ্রনের সাথে চুড়ি মানায় না দেখে তুলি পরেনি। এখন বুঝো!

তুলি মিনমিন করে বললো,
‘মনে ছিলো না।’
‘এখন থেকে থাকবে।’

শুভ্রর কাঠকাঠ জবাব। শুভ্র পকেট থেকে দুটো সোনার সাধারণ গড়নের চুড়ি বের করে তুলির হাতে পরিয়ে দিলো।অনেক আগে শুভ্র এটা বাসর ঘরে উপহার দিবে বলে কিনে রেখেছিল। বাসর হওয়ার আগেই বউ ফুরুত হয়ে যাচ্ছে, তাই সেটা দেওয়া লাগলো এক্ষুনি। তুলি হতবম্ব হয়ে হাতে লেপটে থাকা সোনার চুড়ির দিকে চেয়ে রইলো। শুভ্র বললো,

‘ইউ আর শুভ্র’স ওয়াইফ। মাইন্ড ইট।’

তুলি এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। শুভ্রর চোখে চোখ রেখে বললো,

‘শুধুই ওয়াইফ? আর কিছু নই?’

শুভ্র থামলো। তার দৃষ্টির ভাষা বদলে গেলো। কেমন অন্যরকম চোখে তুলিকে দেখলো। তুলির কপালের চুল আঙুলে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে আত্মবিশ্বাসী স্বরে বললো,

‘ইউ আর শুভ্র’স এভরিথিং, মিস ছাত্রী। ইউ আর মেকিং মি ক্র্যাজি ডে বাই ডে। আমাকে ছাড়া অন্য পুরুষের দিকে অন্য নজরে তাকানো দূরের কথা, ভাবলেও খবর আছে তোমার। ইউ আর কমপ্লিটলি শুভ্র’স, কী মনে থাকবে মিস ছা~ত্রি!’

#চলবে

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ❤ | পর্ব ১৩ থেকে ১৬ | Arrange Marriage | ভালোবাসার গল্প | রোমান্টিক গল্প | AduriPakhi এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.
A+
A-
দুঃখিত লেখা কপি করার অনুমতি নাই😔, শুধুমাত্র শেয়ার করতে পারবেন 🥰 ধন্যবাদান্তে- আদুরি পাখি