#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৩২
প্রায় এক সপ্তাহ পর বাবার বাসায় এসে তুলি আনন্দে আশপাশ ভুলতে বসেছে। জোবায়েরের সঙ্গে অনেকদিন পর আজ স্পাইডার ম্যান মুভি দেখতে বসেছে। জোবায়ের বুঝিয়ে দিচ্ছিল তুলিকে মুভির কাহিনি। মুভি দেখার ফাঁকে শুভ্রর কল এলো। তুলি কল রিসিভ করে রুমে আসল-
‘বাসায় ফিরেছেন?’
‘হ্যাঁ, খাওয়া দাওয়া শেষ করলাম মাত্র।’
‘আম্মু খেয়েছে? উনার জন্যে শুটকি রেঁধে রেখে এসেছিলাম।’
‘হ্যাঁ, খেয়েছে। বাপের বাড়ি ভালো লাগছে তো?’
‘অনেক।’
‘কী করছিলে?’
‘স্পাইডার ম্যান মুভি দেখছিলাম।’
শুভ্র এ কথা শুনে প্রথমে অবাক হয়ে, পরপরই হেসে উঠল। বললো-‘এত বড় হয়ে এখনো জোবায়েরের সঙ্গে স্পাইডার মুভি দেখো?’
তুলি লজ্জা পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর একটু থেমে ম্লান কণ্ঠে বলল- ‘আর কিছুদিন পর থেকে ‘মা-মা’ জিনিস দেখার সময় হয়ে যাবে, এখন এগুলোই দেখি।’
শুভ্র হাসছিল, তুলির কথা শুনে হাসি থামিয়ে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল-‘মানে? কেন?’
তুলি বলতে চাইলো কিছু। শুভ্রকে জানাতে চাইল নিজের সন্দেহের কথা। মুখ খুলতে চাইলে, পরপর থেমে যায়। সন্দেহের বশে এতবড় সুখবর শুভ্রকে এখুনি জানাবে না তুলি। পরে যদি সন্দেহ ভুল হয়, তবে কষ্ট পাবে শুভ্র। আগে শিউর হোক, জানুক সে সত্যি আসছে। তারপর একটা বড় সারপ্রাইজ দিয়ে শুভ্রকে জানাবে তাদের দুজনের অংশের কথা।তুলি শুভ্রের প্রশ্নের উত্তর চেপে গেলো। আরও কিছুক্ষণ শুভ্রর সঙ্গে কথা বলে নিল। তারপর একটু পর শুভ্র নিজেই বললো- ‘আমরা পরে কথা বলবো। এখন যাও, বাবা মার সঙ্গে সময় কাটাও। অনেকদিন পর আসলে না?’
তুলি সায় দিল শুভ্রর কথা। কল রেখে গেলো ইয়াসমিনের রুমে। ইয়াসমিন চুল আঁচড়াচ্ছেন। তুলি গিয়ে নিজের হাতে চিরুনি তুলে আঁচড়ে দিতে লাগলো ইয়াসমিনের চুল। ইয়াসমিন আরামে চোখ বুজে আছেন। জিজ্ঞেস করলেন-‘ওই বাড়িতে দিনকাল কেমন কাটছে তোর, তুলি?’
তুলি আনমনে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে জবাব দিলো-‘ভীষণ ভালো।’
‘তুই যে এলি শুভ্র কিছু বলেছে? অনুমতি নিয়ে এলি তো?’
‘হু, উনিই বলেছেন ঘুরে আসতে।’
ইয়াসমিন গল্প করতে লাগলেন তুলির সঙ্গে। একসময় তুলি দোনামোননা করে করে বললো-‘মা, আজ সন্ধ্যার পর একজায়গায় যাব। আমার সঙ্গে তুমি যাবে?’
‘কই যাবি? তুই না ফিরবি সন্ধ্যার পর?’
‘রাতে ওখান থেকেই সোজা ওই বাড়ি চলে যাব, এদিকে আর আসবো না।’
‘আচ্ছা যাবো। আগে বল কই যেতে চাইছিস? ফ্রেন্ডের বাসায়?’
‘না, হসপিটাল।’
‘হসপিটালে কেন?’
‘আমি সোনোগ্রাফি করবো।
‘সো-‘
ইয়াসমিন অবাক হয়ে তুলির দিকে তাকালেন। তুলি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। মায়ের সামনে আর কিছু বলার নেই তার। ইয়াসমিন মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে পরপর খুশি হয়ে বললেন-‘কিছু আন্দাজ করেছিস? পরীক্ষা করবি? কিট দিয়ে কর আগে, সন্ধ্যার পর যাব রিপোর্ট করতে।’
‘কিট আনিনি সঙ্গে।
‘দাঁড়া, আমি দেখি আছে কিনা ঘরে। নাহলে নিয়ে আসছি আমি ফার্মেসি থেকে।’
ইয়াসমিন উঠতে চাইলেন। তবে তুলি পেছন থেকে তার হাত আটকে দিল। ইয়াসমিন তাকালেন, তুলি বললো-‘আম্মু- আমি ডাইরেক্ট রিপোর্ট করব।’
ইয়াসমিন আর মেয়েকে ঘাটালেন না। বিছানায় বসলে, তুলি মায়ের কোলে মাথা রাখে। ইয়াসমিন তুলির চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ইয়াসমিনের চোখ দুটো ছলছল করছে। সেদিনের তুলি, ওই বাচ্চা তুলি আজ নিজেও মা হবে। আবেগে চোখ থেকে জল পড়তে চাইলে, ইয়াসমিন মুছে ফেলেন। তুলি মায়ের কোলে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।ইয়াসমিন তুলিকে বিছানায় শুইয়ে আলমারি ঘেঁটে পুরনো শাড়ি বের করলেন। কটা বাচ্চাদের কাথা সেলাই করতে হবে- এখন থেকে শুরু না করলে পরে যদি দেরি হয়ে যায়।
____________________
রিপোর্ট হাতে বিছানার উপর বসে আছে তুলি। শুভ্র এখন চেম্বার থেকে ফিরেনি। যখন ফিরবে, তুলির রিপোর্ট দেখবে- কী করবে তখন শুভ্র? কিভাবে সামলাবে নিজেকে। তুলি আজ মনের মতো সেজেছে। গায়ে শুভ্রর দেওয়া সেই কাবিনের দিনের জামদানি শাড়ি, হাতে শুভ্রর দেওয়া চুড়ি, শুভ্রর নামের খোদাই করা আংটি অনামিকা আঙুলে। সাজ নেই তেমন, তবে কপালে টিপ আর কাজল দিয়েছে। শুভ্র এতেই মুগ্ধ, তুলি জানে। শুভ্র এলো, আফরোজার সঙ্গে দেখা করে রুমে টোকা দিল। তুলির পা কাঁপছে, হাতের থাকা রিপোর্টও কাঁপছে। তুলি রিপোর্ট হাতে এগিয়ে গেলো। উত্তেজনায় হাঁটতেও পারছে না তুলি। অবশ লাগছে নিজেকে। ওপাশ থেকে শুভ্র মিহি স্বরে ডাকলো একবার- ‘তুলি, ভেতরে আছো? দরজা খুলো।’
তুলি ঢোল গিললো। রুমের লাইট নেভানো। মোমবাতি জ্বালান অনেকগুলো। তুলি সিটকিনি খুলে দিল দরজার। শুভ্র বলতে থাকে-‘কী করছিল-‘
সঙ্গেসঙ্গে তুলির দিকে চেয়ে থমকে যায় শুভ্র। তুলি দরজায় বাঁকা হয়ে হেলান দিয়ে আছে। ডান হাতে শাড়ি খামছে ধরে আছে- বাম হাত দরজা ঠেসে রাখা। শাড়িটা এমনভাবে পড়েছে, কোমর উন্মুক্ত, গায়ে লেপ্টে আছে একদম। শুভ্র ঢোক গিলে। তুলির পা থেকে মাথা অব্দি দেখে ভ্রু বাঁকিয়ে বলে- ‘পাগল করার ধান্দায় আছেন নাকি- মিসেস শুভ্র?’
তুলি শুভ্রর টাই একহাতে ধরে টেনে শুভ্রকে রুমের ভেতরে আনল। তারপর নিজেই দরজায় সিটকিনি তুলে দিল। শুভ্র দরজা লক করার আওয়াজে পেছন ফিরে একবার দেখলো। তুলি আঙুল দিয়ে শুভ্রর মুখটা আবার নিজের দিকে করে নিলো। শুভ্র আবারও ঢোক গিলে। তুলিকে আপাদমস্তক বড্ড সুন্দর দেখাচ্ছে। তুলি শুভ্রর সম্পূর্ন মুখে আঙুল ঘুরিয়ে বললো-‘পেছনে কি, হুঁ? আমাকে দেখুন, শুধু এবং শুধু আমাকে।’
শুভ্র এবার হাসলো। তুলির কানের কাছে ফিসফিস করে শুভ্র বললো-‘আ’ম ডায়িং।’
তুলির বুকটা কেঁপে উঠে। শুভ্র তুলির কানের লতিতে চুমু খেলো। তুলি কেঁপে উঠে শুভ্রর শার্ট চেপে ধরলো। শুভ্র দুহাতে তুলির উন্মুক্ত কোমর চেপে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। তুলি শুভ্রর গলার টাই খুলে মাটিতে ফেলল। শুভ্র আনমনে দেখে যাচ্ছে তুলিকে। শুভ্র একসময় গাঢ় গলায় বললো—‘ইউর গ্লোসি লিপস মেকিং মি ক্রেজি। ক্যান আই কিস?’
তুলি মায়া দৃষ্টিতে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র মুখটা এগিয়ে নিলে তুলি মাথা পিছিয়ে নেই। শুভ্র ভ্রু বাঁকায়- ‘কী?’
তুলির শুভ্রর বুকে হাত রেখে ঠেলে বললো-‘এত অধৈর্য্য কেন? এখন তো মাত্র শুরু।’
শুভ্র ব্যস্ত ভঙ্গিতে তুলির কোমরে চাপ দিয়ে নিজের দিকে টেনে বললো-‘অধৈর্য্য বানানো হয়েছে আমাকে। কাম, জাস্ট ওয়ান কিস।’
শুভ্র এগিয়ে আসলে, তুলি আবারো সরে শুভ্রর থেকে জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। শুভ্র হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে তুলির দিকে।
তুলি থামল। তারপর ধীর হাতে শুভ্রর ডান হাত নিজের পেটের উপর রাখল। শুভ্র বুঝতে পারলো না প্রথমে তুলির এ আচরণের অর্থ। প্রথমে স্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে হঠাৎই চোখ বড়বড় করে তুলির পেটের দিকে তাকিয়ে আবার তুলির দিকে তাকাল। তুলির শুভ্রর কানের কাছে ফিসফিস করে শোনাল-‘ছোট্ট শুভ্র আসছে। আপনার অপেক্ষার ফল ফাইনালি আসছে,শিশু ডক্টর।’
শুভ্র চমকালো, ভীষণ চমকে তুলির পেটে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। তুলি হালকা হেসে আবারও বললো- ‘আপনার এতদিনের ইচ্ছা শেষ অব্দি পূরণ হচ্ছে। কেমন লাগছে ডাক্তার মশাই?’
আবেগে শুভ্রর চোখের কোণে অল্প কিছু পানি জমেছিল। শুভ্র পানিটুকু আড়াল করে তুলিকে ছেড়ে নিজের কোমরের দুপাশে হাত দিয়ে উপরের দিকে চেয়ে ঢোক গিলছে। শুভ্র ভয়াবহ নার্ভাস। কী বলবে, এমন একটা অবস্থায় কেমন রিয়েক্ট করা হয় শুভ্র জানে না। সে প্রথম বাবা হচ্ছে, বাচ্চা সম্পর্কিত অনুভূতিতে সে নতুন। শুভ্র ঢোক গিলছে, তার অ্যাডাম অ্যাপলস ফুলছে বারবার। তুলি শুভ্রকে সময় দিল। শুভ্র মাথা নিচু করল। দুপাশে মাথা নেড়ে নিজের কাঁদোকাঁদো অনুভুতি সামলে নিয়ে তাকাল তুলির দিকে। তুলি আবার হাসল। ভ্রু নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল- ‘কেমন লাগছে?’
শুভ্র এবার হালকা হাসার ভান করে তুলিকে আচমকা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ডুবাল। তুলিকে যতটা পারে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে দিল। পিষে ফেলতে চাইছে যেমন তুলিকে নিজের সঙ্গে। তুলি সাবধানতা অবলম্বন করে পেটে এক হাত রেখে শুভ্রকে অপরহাতে জড়িয়ে রাখলো। শুভ্র ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বললো-‘আমাকে বাবা হওয়ার মতো বেস্ট একটা ফিলিংসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ তুলি। তুমি- তোমাকে ভা-ভালোবাসি,ভা-‘
শুভ্র আর বলল না কিছু। তুলি অনুভব করছে তার ঘাড় ভিজে যাচ্ছে। ওমা, শুভ্র কাঁদছে? তুলি বোকা হয়ে গেলো একদম, শুভ্রকে জোর করে নিজের থেকে ছাড়াতে চাইলে শুভ্র আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তুলি হাল ছাড়ল। শুভ্র নিজের চোখের জল তুলিকে দেখাতে নারাজ, তাই তুলিও জোর করলো না। একসময় শুভ্র নিজেই নিজেকে সামলে সরে আসল। অন্যপাশে মুখ লুকিয়ে চোখ মুছে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো- ‘কয় মাস? এ খবর কখন পেলে? কাল? আজ? আজ পেয়েছো? আর কেউ জানে? আম্মু জানে?’
‘বলছি সব। ভ্রুণের বয়স ২ মাস ৭ দিন। কাল বাবার বাসায় ছিলাম না? আম্মুকে নিয়ে গিয়েছিলাম সনোগ্রাফি করতে। রিপোর্ট আজ ক্লিনিক থেকে ফেরার সময় নিয়ে এসেছি। রিপোর্ট পেয়ে আপনাকেই প্রথম বললাম।’
শুভ্র হা হয়ে গেলো। বললো-‘বিয়ের প্রথমরাতে ছক্কা? আমার বাবু বাবাকে বেশি অপেক্ষা করায় নাই।’
তুলি লজ্জা পেয়ে বললো-‘কী ভাষা মুখের।’
শুভ্র হেসে বললো-‘যাও ভাষা ঠিক করছি। আগামীকাল আমার সঙ্গে আবার যাবে ডাক্তারের কাছে। আমরা মহুকে কনসাল্ট করব আমাদের বেবির জন্য। ও তো গাইনোকলোজি স্পেশালিস্ট।’
তুলিও সায় দিলো। শুভ্র তুলিকে সামনে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর কাঁধে থুতনি রেখে বলতে লাগলো-‘এখন থেকে বাইরে চলাচল বন্ধ, ঘরেও তেমন কিছু করা লাগবে না। বুয়া এসে তো সব করেই যাই। রান্না আর বাসন থাকে। এগুলো আমি ঘরে থাকলে করে দিবো। ওয়েট, রান্নার জন্যে নতুন বুয়া রাখলেই তো হয়? কী বলো?’
‘বুয়ার হাতের রান্না খাবেন? আগে খেয়েছেন?’
‘না, তবে এখন থেকে খাবো।’
‘না, তার কোনো দরকার নেই। আমি রান্না করবো। আর আম্মু তো আমাকে সাহায্য করেনই। সমস্যা হবে না কোন।’
শুভ্র একটু থামল। তারপর দোনামোনা করে বললো-‘ ক্লিনিক করা লাগবে এ কদিন? বাদ দিলে হয়না? যদি কিছু হয়ে যায়।’
তুলি পেটের উপর রাখা শুভ্রর হাতের উপর হাত রাখল। বললো-‘ক্লিনিক ছুটি নিব ৭ মাসের সময়। এখন নেওয়া যাবে না। নতুন চাকরি, বাদ দিলে আর নিবে না আমাকে।’
‘ঠিকাছে, আমি জোর করব না তোমাকে। তবে এখন থেকে রিকশা বা সিএনজি কিছু চড়া যাবে না। আমাদের গাড়ি ইউজ করবে।’
‘তাহলে আপনি কী দিয়ে আসবেন? আপনার হসপিটাল তো আমার থেকেও বেশি দূরে।’
‘আমি একটা সিএনজি রিজার্ভ করে নিব এই কয়েক মাসের জন্যে। সিএনজি নিবে-আনবে।’
আরও কিছুক্ষণ কথা বললো দুজন। শুভ্রর হাতে তুলির সনোগ্রাফির ছবি। অবশ্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না ছবিতে। তবুও শুভ্র হাতে ছবি নিয়ে বসে আছে। তুলি বেশ অনেকক্ষণ হলো ঘুমিয়েছে। শুভ্র তুলিকে বিছানায় শুইয়ে বারান্দায় গেল। এক হাতে নিজের বাচ্চার সনোগ্রাফির ছবি, অপরহাতে শুভ্রর বাবার ছবি। শুভ্র বারান্দার দোলনায় বসে বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর একসময় বললো-
‘আব্বু, আমি বাবা হচ্ছি।’
থামল শুভ্র। গলাটা আজ কাঁপছে কেন এত?কথাই বলতে পারছে না শুভ্র। ছবিতে শুভ্রর বাবা কথা বলতে পারেন না। যদি পারতেন খুশিতে শুভ্রকে বলতেন-‘এই তো আসল পুরুষের মতো কাজ। আমার ছেলে বাবা হচ্ছে, মিষ্টি বিলাব। মিষ্টির কেজি এখন কত করে রে শুভ্র? আমাদের সময় তো ছিলো ১ কেজি ১৮০ টাকা।’
শুভ্র থামে কিছুক্ষণ- তারপর নিজের মতো করেই বলতে লাগলো-
‘আমি তোমায় সেদিন বলেছিলাম, আমার ছাত্রিকে কিভাবে বিয়ে করবো। আম্মু কেন এমন ছেলেমানুষি সিদ্ধান্ত নিল। কিম্তু এখন- এখন আমি ভাবছি-আম্মু ছাড়া আমাকে আর কেউই বুঝে না আব্বু। আম্মু জানতেন, ওই মেয়ে, ওই ছাত্রির মধ্যেই আমার সব সুখ থাকবে। আর দেখো- থাকলোও। আমি ওই মেয়ে ছাড়া এখন কিছুই বুঝি না আব্বু। ওই মেয়ে আমার সমস্ত স্বত্তার মধ্য খুব বাজে ভাবে মিশে গেছে আব্বু। এখন ওই মেয়ের মধ্যে আমার আরেকটা স্বত্তা আসছে। তোমার শুভ্রর সন্তান। তুমি দাদা হচ্ছো। খুশি তুমি? ‘
কথা বলতে বলতে শুভ্রর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল শুভ্রর বাবার ছবির মধ্যে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে শুভ্র জল মুছে ফেলল। বাবার ছবিকেই হাত বাড়িয়ে সনোগ্রাফির ছবি দেখিয়ে বললো-‘দেখো আব্বু, এটা আমার সন্তান। হাত পা বোঝা যাচ্ছে না এখন। কিম্তু আর কদিন, তারপর সব বোঝা যাবে। তোমাকে তখন আরেকবার দেখাব। এখন এটাই দেখো।’
শুভ্র আনমনে বাবার ছবির দিকে অনেক কথা বললো। তুলি ঘুমে ছিল, শুভ্রর কথা শুনে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ শুভ্রর সব কথা শুনছিল। শুভ্র কাঁদছে, আর কথা বলছে। তুলি শুভ্রকে আর বিরক্ত করলো না। জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ভালোবাসার লোভী নারীর মতো শুভ্রর সব কথা শুনতে লাগল।
#চলবে.............
#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#শেষ_পর্ব
এতগুলো বছর পর, শুভ্রদের বাড়িতে যেন খুশি উপচে পড়ছে। তুলি মা হবে- কথাটা মুহূর্তের মধ্যে দু পরিবারের ছড়িয়ে গেল। আফরোজা আজ তুলিদের পুরো পরিবারকে দুপুরে ও রাতে খাবারের দাওয়াত করেছেন। আজ আফরোজা নিজে রান্নাঘরে রান্না বসিয়েছেন। তুলি কয়েকবার গেলো সাহায্য করতে। আফরোজা রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বারবার। শুভ্র হাসপাতালে গিয়েছে। চেয়েছিল আজকের দিনটা ছুটি নিতে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকায় আজ তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি। তুলি রুমে এতোক্ষণ বসে বসে বিরক্ত হচ্ছিল। ঘুমাতে চইল, ঘুম আসছে না। অশান্তি করছে শুধু। তুলি একটা সময় বই রেখে উঠে শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে রান্নাঘরে গেলো। আফরোজা পায়েশ বসিয়েছেন। তুলি আফরোজার পাশে দাঁড়িয়ে পায়েস দেখে ‘হো-হো’ করে উঠে বললো- ‘পায়েস রাঁধছো? ভীষণ সুন্দর ঘ্রাণ বেরিয়েছে কিন্ত।’
আফরোজা উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন- ‘খাবি তুই? প্লেট নিয়ে আয়, দিচ্ছি।’
তুলি কথামতো প্লেট নিয়ে এলো। আফরোজা পায়েশ চেখে সবার আগে তুলির প্লেটে দিলেন। তুলি পায়েস খেলো একটু। আফরোজা বললেন-‘মজা হয়েছে? মিষ্টি ঠিকাছে?’
তুলি মাথা নেড়ে বললো—‘ভীষণ ভালো হয়েছে।’
আফরোজা হাসলেন। গরুর গোশতের তরকারি বসিয়েছেন চুলায়। সেটা একটু নেড়ে, আগুনের আঁচ আরও বাড়িয়ে দিলেন। তুলি রান্নাঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে পায়েশ খাচ্ছে। আফরোজা একসময় রান্না রেখে তুলির দিকে তাকালেন। আনমনে নিজের এতক্ষণে চেপে রাখা খুশিটুকু প্রকাশ করে বললেন-
‘তুলি? মা তুই আমাদের মা-ছেলের জীবনে খুব ভাগ্য নিয়ে এসেছিস। এই দেখ না, আগে শুভ্র কতটা বিয়ে বিমুখ ছিল। অথচ এখন? কতটা বদলে গেছে। জানিস- আজ সকালে ও রুমে এসে আমাকে জড়িয়ে কেঁদেই দিয়েছে প্রায়। বাবা হচ্ছে- কতটা খুশি আমার ছেলে। বলছে- আমার জন্যে নাকি বুড়ো বয়সে খেলার সাথী আনছে। আমি ভালো থাকবো নাতি নাতনী নিয়ে, নাতি-নাতনীগুলো নাকি আমার নেউটা হবে। দেখ তো ছেলের পাগলামি।’
তুলি মুগ্ধ চোখে আফরোজার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। এই মা-টা আর কতভাবে তুলিকে মুগ্ধ করবে? আর কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসবে শুভ্র-তুলিকে? আফরোজা মুখ অন্যপাশে লুকিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। চোখটা আবারও ভিজে উঠল উনার। তুলি হালকা হাসল। পায়েশের প্লেট তাকের উপর রেখে এগিয়ে এলো আফরোজার দিকে। আফরোজা তুলির দিকে তাকালেন। তুলি হালকা হেসে আলতো করে আফরোজাকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় গলায় বললো-‘আমি চাই, আমার সবগুলো বাচ্চা তোমার নেউটা হোক আম্মু। তুমি তাদের ষোলোআনা পালবে, আমি শুধু মা হবো। তুমি দাদি--মা-বাবা সব হবে। আমি চাই, আমার বাচ্চাগুলো তোমাকে যেন অন্ধের মতো ভালোবাসে।’
আফরোজা অবাক হয়ে তুলির দিকে তাকালেন। তুলি হাসিমুখে আফরোজার দিকে চেয়ে রইলো। আফরোজার চোখ আবারো ভিজছে।
তুলি হেসে দুহাতে আফরোজার ভিজে চোখ মুছে দিয়ে বললো-‘পায়েসটা মজা হয়েছে। আরেক প্লেট দেওয়া যাবে?’
_____________________
তুলির প্রেগন্যান্সির আজ প্রায় আটমাস। আজকাল তুলি একদম ঘরবন্দি বলা যায়। শরীরটা ইদানীং এত খারাপ হয়েছে- বমি, ডায়েরিয়া,জ্বর লেগেই থাকে।শুভ্র এটা নিয়ে মহুর সঙ্গে কথা বলেছে। মহু জানিয়েছে- তুলির সেরকম কোনো কমপ্লিকেশন নেই। এই অসুখগুলো লেগেই থাকবে এখন। খাওয়া দাওয়া ঠিক রাখতে বললো।
শুভ্র মহুর চেম্বার থেকে মাত্র ফিরল। রুমে ঢুকে দেখে তুলি বিছানায় অসহায়ের মতো পড়ে আছে। তুলিকে এভাবে দেখে শুভ্রর চরম মন খারাপ হয়ে গেলো। ইচ্ছে করছে, ছুটে ওই মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে পিষে ফেলতে। তুলির এত কষ্টগুলো কিছুটা ভাগও তো করতে পারছে না শুভ্র। শুভ্র কাঁধের ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হয়ে তুলির পাশে বসল। তুলি ঘুমাচ্ছে-শুভ্র আলতো করে মাথায় হাত বুলাতেই ঘুম ভেঙে গেলো তুলির। আজকাল তুলির ঘুমটাও বড্ড পাতলা হয়ে গেছে। শুভ্রকে মাথার পাশে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করল। আটকে দিল শুভ্র।নরম গলায় জিজ্ঞেস করল- ‘কী হয়েছে? তোমাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। শরীর খারাপ বেশি?'
তুলি উঠে বসল। শুভ্র তুলির পিঠের পেছনে বালিশ দিল। তুলি বালিশে হেলান দিয়ে বসল। আড়মোড়া ভেঙে বললো-‘নড়তে পারছি না। আজ সকাল থেকে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে-বাচ্চার পজিশন ঠিক আছে তো? ‘
শুভ্র আজকের রিপোর্টটা দিল তুলির হাতে। তুলি রিপোর্ট দেখে বললো-‘কমপ্লিকেশন তো নেই তেমন। তাও কেন এত খারাপ লাগে শরীর।’
শুভ্র তুলির পেটে হাত রাখল। পেটটা বেশ ফুলেছে আজকাল। শুভ্র মুখ বাড়িয়ে শাড়ির উপর দিয়েই পেটে চুমু খেল। তুলি শুভ্রর চুলে হাত বুলালো, তারপর মাথা তুলে বললো-‘বেবি খুব দ্রুত বড় হচ্ছে,ওয়েট বাড়ছে, হয়তো এইজন্যে।’
তুলি কথা বললো না। আলতো করে নিজের পেটে হাত বুলালো। শুভ্র তুলিকে একহাতে আগলে তুলির পেটে থাকা হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। দুজন একসঙ্গে উপভোগ করছে অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব।
শুভ্র একসময় মনে পড়ায় বললো-‘ মহু আগামী ১৫ তারিখ ডেলিভারির সম্ভাব্য ডেইট দিল।’
তুলি অবাক হয়ে বললো- ‘আগামী মাসের পনেরো তারিখ? অনেক তাড়াতাড়ি হয়ে গেলো না? নয় মাস হয়ে এক সপ্তাহ হবে শুধু।’
শুভ্র বললো-‘বাচ্চার ওয়েট বেশি। এর বেশি সময় পেটে থাকলে বাচ্চার ক্ষতি হবে।’
তুলি এ কথা শুনে ঠোঁট উল্টে বললো-‘আমি কী এত খাবারই খাচ্ছি? বাচ্চার উপরও এফেক্ট পড়ছে, দেখেছেন? তারপরও তো রোজ এতগুলো খাবার খাওয়ান।’
শুভ্র চোখ পাকালো। বললো-‘এসব কী ধরনের কথা। বাচ্চার ওয়েট বাড়া ভালো, হেলদি থাকবে। তুমি এভাবে বললে- মায়ের নজর লাগে জানো না?’
তুলি নিজের ভুল বুঝতে পেরে দাঁত দিয় জিহ্বা কামড়ে কান ছুয়ে ‘সরি’বলল। শুভ্র রাগ কমলো। আলগোছে তুলিকে আগলে কপালে খুব সময় নিয়ে চুমু খেলো। তুলি শুভ্রর শার্ট চেপে ধরে শান্তিতে চোখ বুজলো। শুভ্র সরে এসে জিজ্ঞেস করল-‘আজ দুপুরে খাওয়া হয়েছে?’
তুলি মাথা নাড়লো-‘আম্মু খাইয়ে দিয়েছে।’
শুভ্র প্রশ্ন করল- -‘কী দিয়ে খেয়েছ?’
‘কবুতরের মাংস আর পুঁইশাক, শেষে ডাল দিয়েও খেয়ছি।’
শুভ্র আশ্বস্ত হতে দেখা গেলো। সে হাত বাড়িয়ে তুলির বালিশ ঠিক করে দিয়ে বললো-‘ঘুমাও, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’
তুলি শুয়ে পরলো। শুভ্রও নিজেও তুলির পাশে শুয়ে দুজনের উপর কম্বল টানল। তুলি বালিশ ছেড়ে এগিয়ে এসে শুভ্রর বুকে মাথা রাখল। শুভ্র নিজের বুকের ভেতর তুলিকে আগলে রাখল। চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললো—‘আমার এখন কী মন চাইছে জানো? তোমাকে বুকের মধ্যে একদম পিষে ফেলতে, বিশ্বাস করো। আজকাল গুলুমুলু হওয়ায় দেখতে কিন্তু মারাত্মক লাগে তোমাকে।’
তুলি মাথা তুলে তাকাল। শুভ্রর মনের আশা বুঝে- হতাশ গলায় পেটে হাত রেখে বললো-‘ও ব্যথা পাবে।’
শুভ্র হাসল। তুলির কপালে গাঢ় চুমু খেয়ে হেসে বললো-‘জানি, তাই আটকাচ্ছি নিজেকে। বেবী আসার পর তোমার রক্ষে নেই সুন্দরী। এক আনাও ছাড় পাবে না, লিখে রাখো।’
তুলি লজ্জা পেয়ে শুভ্রর বুকে মুখ ঘষলো। শুভ্র হেসে উঠে তুলিকে দুহাতে আগলে ধরলো। মেয়েটাকে ইদানীং এত আদুরে লাগে শুভ্রর!
________________
ডেলিভারির ডেইট দুদিন পেরিয়ে গেছে। অথচ তুলির লেভারপেইন উঠছে না। বাচ্চার অবস্থাও বেশ ভালো না, পেটে পানি কম একদম। লেভার পেইনের অপেক্ষা করলে-বাচ্চার আরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। শুভ্রকে মহু এ কথা বলার সঙ্গেসঙ্গে শুভ্র যন্ত্রমানবের ন্যায় বলে দিল-‘সিজার করে ফেলো।’
ইয়াসমিন আঁচলে মুখ চেপে কাঁদছেন। মহু বললো-‘আমি ওটি রেডি করছি। তুই থাকবি ওটিতে?’
শুভ্র ঢোক গিলল। তারপর থেমেথেমে বলল-‘থাকবো আমি।’
মহু ওটি রেডি করতে গেলো। শুভ্র চেয়ারে বসে মাথার চুল দুহাতে খামছে মাথা নিছু করে কিছুক্ষণ বসে থাকল। তারপর আচমকা উঠে হাঁটা ধরল তুলির কেবিনের দিকে। তুলি শুয়ে আছে। তাঁকে এনেসথেসিয়া দেওয়া হচ্ছে। ব্যথায় তুলির মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। পিঠে ঘা ফুটছে যেনো। শুভ্র যেতে চাইলে-তাকে যেতে দেওয়া হল না। ইঞ্জেকশন দেওয়া শেষ হলে শুভ্র ভেতরে ঢুকল। তুলি পেট থেকে পা অব্দি অবশ হয়ে আছে। শুভ্র তুলির পাশের চেয়ারে বসলো। তুলি শুভ্রর হাত একহাতে চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-‘আমাদের বাচ্চাকে সুস্থভাবে আনবেন, শিশু ডক্টর। আমি সব কষ্ট সহ্য করব-কিন্তু আমার বাচ্চার গায়ে একটা আঁচড়ও সহ্য করব না।’
তুলির আবারো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শুভ্র তুলি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঢোক গিলে বললো-‘আমাদের বাচ্চা সুস্থভাবেই আসবে, তুলি। তুমি চোখ খুলে ওকে তোমার কোলে দেখবে, প্রমিজ।’
তুলি এবার আশ্বস্ত হলো অনেক। তুলিকে ওটিতে নেওয়া হলো। অপারেশন শুরু হলো, শুভ্র তুলির একহাত চেপে ধরে আছে। তুলি শুভ্রর দিকে চেয়ে আছে অপলক। শুভ্র তুলির ঘেমে ভিজা কপালে হাত বুলিয়ে দিলো।
পনেরো মিনিট পর শোনা গেলো একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ। তুলি-শুভ্র দুজনেই দুজনের দিকে তাকাল। মহু বাচ্চাকে ধুয়ে টাওয়াল দিয়ে মুড়িয়ে দুজনের সামনে দিল।হেসে বললো-
‘মেয়ে হয়েছে তোদের।’
মেয়ে না ছেলে শুভ্র কিছুই বুঝল না। শুধু দেখল- বাচ্চাটা লাল একদম, কাঁদছে ভীষণ। শুভ্র হ্যান্ড স্যানিটাইজ করে বাচ্চাকে কোলে নিল। তুলি ক্লান্ত ভঙ্গিতে শুভ্রর কোলে বাচ্চাকে দেখছে। শুভ্র বাচ্চাকে তুলির বুকে শোয়ালো। এতোদিম পেটে লালন করা নিজের অংশ- ছোট্ট ওই শরীর ছুতে পেরে তুলি কেঁদে ফেলেছে একদম। পাগলের মতো বাচ্চার চুলে-মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে ইচ্ছেমতো চুমু খেয়ে বললো-‘আম্মা, আম্মা, আমার আম্মা।’
শুভ্র ভেজা চোখে মা-মেয়ের ভালোবাসা দেখছে। মহু এবার বললো-‘তুলি, তোমার রেস্ট দরকার। তোমাকে রেস্ট রুমে শিফট করা হবে। ঘুম থেকে উঠে বাচ্চাকে ইচ্ছেমতো আদর করিও।’
তুলি শুনছে না তবুও। দুহাতে বাচ্চাকে আগলে ধরে আছে। শুভ্র এগিয়ে এসে তুলির কোলের বাচ্চার শরীরে হাত রেখে ইশারা করলো। তুলির ছাড়তে ইচ্ছে করছে না, তবুও বাচ্চাকে ছাড়ল।শুভ্র দুহাতে বাচ্চাকে কোলে নিলো। তুলিকে রেস্টিং রুমে শিফট করা হয়েছে।
শুভ্রর হাতে সাদা তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো একটা ছোট্ট বাচ্চা। বয়স সবে কয়েক মিনিট। ইয়াসমিন-জোবায়ের-আফরোজা সবাই বাচ্চাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। জোবায়ের এই ফাঁকে ইয়াজিদকে ভিডিও কলে বেবী দেখাল। শুভ্র এতোক্ষণ ধরে ফ্যালফ্যাল চোখে বাচ্চার দিকে চেয়ে আছে। এত সুন্দর একটা বাচ্চা শুভ্রর? বিশ্বাস-ই হচ্ছে না তার। আফরোজা পাশ থেকে বললেন- ‘অ্যাই শুভ্র- বাচ্চা তো দেখি পুরো তোর মতো হয়েছে রে।’
শুভ্র এবার চোখ সরালো। ছলছল করছে শুভ্রর চোখ দুটো। সে হালকা গলা খাকারি দিয়ে নিজেকে সামলে বললো- ‘কই? মেয়ে ওর মায়ের মতোই হয়েছে। দেখো, চোখ দেখো। পুরো তুলি।’
‘কিন্তু গঠন কিন্ত বাপের পেয়েছে।’
আফরোজা হাসলেন। ইয়াসমিন চোখের জল মুছে বললেন-‘বাচ্চা কিন্তু নাক পেয়েছে আফরোজার মতো। দেখ তোর মতোই খাড় নাক।’
আফরোজা হেসে আলতো করে বেবির নাক ছুলেন। জোবায়ের ঠোঁট উল্টে বললো-‘তোমরা এখনই কিভাবে বাচ্চা কার মতো হয়েছে বলতে পারছ? আমার তো বেবিকে দেখে কারো মতোই লাগছে না।’
শুভ্র হাসল এ কথা শুনে। মুখ বাড়িয়ে ছোট্ট মেয়ের কপালে গাঢ় চুমু খেল। আবেগে ভেসে বললো- ‘আম্মু, ও আম্মু? তোমার ক্ষুধা পেয়েছে? একটু অপেক্ষা করো। মায়ের ঘুম ভাঙ্গুক, তারপর তোমাকে খাওয়ানো যাবে। একটু অপেক্ষা করতে পারবে না আম্মু?’
বাচ্চা মেয়ে বাবার কথা বুঝল না কিছু। শুভ্রর বুড়ো আঙুল নিজের ডান হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। আফরোজা পাশ থেকে বললেন- ‘তুলির ঘুম ভাঙার আগে ওকে ফিডারের দুধ খাওয়াতে পারিস শুভ্র।’
শুভ্র মেয়ের কপালে আবারো চুমু বসালো। এই নিয়ে বোধহয় বিশ বার। মেয়ের মুখটা আঙুল দিয়ে ছুয়ে ছুয়ে বললো- ‘না, আমার মেয়ের পুষ্টির ঘাটতি হবে। ওর মা উঠুক, আমার আম্মু অপেক্ষা করবে। করবে না আম্মু?’
শুভ্র মেয়েকে প্রশ্ন করলো। অথচ শুভ্রকে নিরাশ করে বাচ্চাটা আবারও গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলো। শুভ্র এবার হাল ছেড়ে অসহায় চোখে আফরোজার দিকে তাকালো। আফরোজা হেসে বললেন-‘দে আমার কোলে দে। আমি ঘুম পড়াচ্ছি।’
শুভ্র বাচ্চাকে এগিয়ে দিল।ইয়াসমিন ও আফরোজা দুজনেই পালাক্রমে পুরো কেবিন জুড়ে এদিক ওদিক হেঁটে বেবিকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলেন। শুভ্র বিছানায় বসে পুরোটা সময় আফরোজার কোলে শুয়ে থাকা নিজের মেয়ের দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলো।
__________________
প্রায় দু বছর টানা পরিশ্রমের পর, অবশেষে শুভ্রর এতদিনের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। শুভ্র হাসপাতালে যাবে বলে তৈরি হচ্ছে। তুলি রান্নাঘরে পায়েস রান্না করছে, রেসিপিটা আফরোজার থেকে নেওয়া। আজ মিষ্টি কিছু রান্না করার পেছনে কারণ হচ্ছে- আজ শুভ্রর বানানো হাসপাতাল উদ্ভোধন করা হবে। এই হাসপাতাল শুভ্র, আরিফ, ফারহান তিনজনের বহু বছরের মেহনতের ফল। আজ এতটাবছর পর শুভ্রর এতদিনের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তুলি পায়েস চুলো থেকে নামাতেই পেছন থেকে শাড়ির আঁচল টেনে ধরলো তুশি। তুলি নিচে তাকিয়ে দেখে- শুভ্র-তুলির দু বছরের মেয়ে প্রত্যুষা হোসেন তুশি ছোট্ট ছোট্ট হাতে মায়ের আঁচল ধরে প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে পায়েস খাবে। তুলি বললো-‘কী আম্মু? ‘
তুশি থেমেথেমে বললো-‘পায়েছ কাবো।’
তুলি বেশ অনেকটা পায়েশ বাটিতে নিলো। তারপর একহাতে পায়েশের বাটি, অপরহাতে তুশি কে কোলে তুলে হেসে বললো-‘বাবার কাছে যাই আমরা? বাবা তোমাকে-আমাকে দুজনকেই পায়েস খাইয়ে দিবে।’
মায়ের বাক্য মেনে তুশি ফোকলা দাঁতে হাসল। ছোট ছোট দুহাতে তুলি গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিল। তুশি দুষ্টুমি করল, তুলির ঘাড়ে ফোকলা দাঁত দিয়ে কামড় বসালো। তুলি ব্যথা পেল কিছুটা। তুশির পিঠে ছোট্ট করে থাপ্পড় বসিয়ে বললো-‘আম্মু, কামড় দেয় না। আম্মু বকবে কিন্তু।’
তুশি মাথা তুলে তুলির দিকে চেয়ে কান ছুয়ে হেসে বললো-‘চলি আম্মু।’
তুলি হেসে মেয়ের গালে চুমু খেল। তারপর পায়েসের বাটি নিয়ে শুভ্রর রুমে গেল।
শুভ্র টাই বাঁধছে। তুলি পায়েশের বাটি টি-টেবিলে রেখে তুষিকে বিছানায় বসালো। নিজেই এগিয়ে এসে শুভ্রকে ঘুরিয়ে টাই বেঁধে দিল। তুশি চোখ বড়বড় করে বাবা-মায়ের ভালবাসা দেখছে। তুলি টাই বেধে শুভ্রর দিকে পায়েসের বাটি এগিয়ে দিল। শুভ্র বাটি হাতে তুশির পাশে বসল। শুভ্র বসতেই তুশি কোলে উঠল শুভ্রর। শুভ্র পায়েশ নিজে খেতে খেতে মেয়েকে-মেয়ের মাকে খাইয়ে দিচ্ছে। শুভ্র তুশিকে জিজ্ঞেস করল-‘আম্মু, তোমার নাম বলো তো বাবাকে।’
‘আমা নাম টুচি।’
‘টুচি না। বল তু শি। বলো তো আম্মু।’
শুভ্র আরেক চামচ পায়েস মেয়ের মুখ তুলে দিল। তুশি পায়েস খেতে খেতে টেনেটেনে জবাব দিল-‘টুউ চিইই।’
তুলি মেয়ের টেনে টেনে নাম বলা দেখে হেসে মেয়ের পেটে দুহাতে কাতুকুতু দিয়ে বললো-‘ওরে দুষ্ট মেয়ে রে, নাম ভেঙানো হচ্ছে নিজের।’
তুশি হাসতে হাসতে শুভ্রর গায়ের উপর পড়ে গেল। শুভ্র মেয়েকে দুহাতে আগলে রাখলো, যেভাবে হাসছে ব্যথা করবে পরে।তুশি হেসে বাবার বুকের মধ্যে ঢুকে চুপ করে বসে শুভ্রর গায়ের টাই নিয়ে খেলতে লাগল।
তুলি একসময় হেসে হেসে শুভ্রর হাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখল। শুভ্র মেয়েকে পায়েস খাইয়ে দিতে দিতে বললো-
‘মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে, না?’
তুশি শুভ্রর টাই নাড়ছে। তুলি মেয়ের দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে বললো-‘হু, স্কুলে যাওয়া শুরু করলে বাসাটা একদম শান্ত হয়ে যাবে।’
শুভ্র দুষ্টু হাসল। তুলির কানের কাছে ঠোঁট ছুয়ে ফিসফিস করে বলল-‘বাসা শান্ত যাতে না হয়, একটা ব্যবস্থা করে দেই?’
তুলি বুঝল না শুভ্রর দু-অর্থের কথা। বোকার মতো জিজ্ঞেস করল-‘কী ব্যবস্থা?’
শুভ্র তুশির দিকে একবার চাইল।তুশিকে নিজের কাজে মগ্ন দেখে তুলির দিকে ঝুঁকে ফিসফি স্বরে বললো-আরেকটা ছোট তুশি আনলে মন্দ হয়না। বাসাটা আবার ভরে যাবে।’
তুলি হা করে শুভ্রর দিকে তাকাল। শুভ্র ভ্রূ নাড়লো,, তুলি লজ্জা পেয়ে শুভ্রর কাঁধে মুখ লুকিয়ে বললো-‘এখন না, আরো পরে। তুশি আরও বড় হোক।’
শুভ্র তুশির দিকে আবারও তাকাল।বাপ-মেয়ের পায়েস খাওয়া শেষ। তাই তুশি শুভ্রর কোল থেকে নেমে দৌড়ে চলে গেলো কোথাও।হয়তো দাদুর কাছে যাচ্ছে।
তুলি উঠে শুভ্রর মানিব্যাগ, ফোন নিয়ে এগিয়ে দিল শুভ্রর দিকে। শুভ্র ওগুলো পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বললো-‘তুমি যাবে না আজ? রেডি হচ্ছো না কেনো?’
তুলি ছোট্ট করে বলল-‘ এটা কী ঠিক হলো? আমার এই হাসপাতালে এক টাকাও কন্ট্রিবিউট নাই। যা করলেন আপনি করলেন। অথচ আমাকে ডিরেক্টর করা হলো হাসপাতালের, একটা পজিশন দেওয়া হলো। সবাই কী ভাববে?’
শুভ্র শুনলো তুলির কথা। সঙ্গে তুলির মন খারাপের কারণও বুঝল।
দুপা এগিয়ে এসে তুলির দু কাঁধে হাত রেখে বললো-‘কে বলল কন্ট্রিবিউট নাই। পুরোটাসময় ছায়ার মতো আমার পাশে থাকা তোমার কন্ট্রিবিউশন, আমাকে ভালোবাসা, আমাকে একটা পরী উপহার দেওয়া, আমার লাইফে তোমার কন্ট্রিবিউশন। শুধু টাকা দিয়ে কারো কন্ট্রিবিউশন মাপবে না তুলি। তাছাড়া লোকের কথা তো আমরা বিয়ের সময় ভাবিনি, তখন তো তোমার স্যার ছিলাম।শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক নিয়ে তখন ভয় পাওনি, তাহলে এখন কেন ভয় পাচ্ছো?’
শুভ্র যখন এভাবে বোঝায় না, তুলির মনে হয় তুলি আকণ্ঠ ডুবে যাচ্ছে। শুভ্র কথা দিয়ে তুলিকে সবসময়, সবসময়ই তুলিকে এতটা জাদু করে ফেলে যে তুলি চমকে যায়। তুলি কিছুক্ষণ শুভ্রর মুখের দিকে চেয়ে থাকল। শুভ্রও দুহাতে তুলির কোমর আঁকড়ে ধরে তুলির দিকে তাকাল।
তুলি একসময় মুগ্ধ মনে হালকা হেসে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরল। শুভ্র দুহাতে আগলে ধরল তার স্ত্রীকে। তুলি ভীষণ আনন্দ নিয়ে বললো-‘আপনি আমার স্যার নন আর। আপনি আমার বর, আমার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের বর। আপনি আমার জীবনে আছেন বলেই, আমি সুখী। এতটা সুখ আর কেউই আমাকে দিতে পারতো না, আপনি পেরেছেন। আই লাভ ইউ, লাভ ইউ সো মাচ।’
শুভ্রর মনে হল- তার কান স্বার্থক। শুভ্র হালকা হেসে তুলিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। চুলে চুমুও খেলো কয়েকটা।
তুলির এলোমেলো চুল গুছিয়ে দিয়ে গাঢ় স্বরে শুভ্র শোনাল-
‘আমিও ভীষণ ভালোবাসি আমার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের এই বউকে।’
#সমাপ্ত........🥰
আমি কিছু বলি এখন- আমার লেখা দুটো গল্পই আছে। এই দুটো গল্পের মধ্যে এটা যখন লেখা শুরু করি- আমি চিন্তাও করিনি আমার এই গল্প পাঠক এত ভালবাসবে। অথচ ভালবাসলো পাঠকরা, মন খুলে নিজেদের মন্তব্য জানলো। আমি এদের ভালোবাসায় পাগল হয়ে লিখেই গেলাম একের পর এক পর্ব। কিন্ত আপনার যে আমাকে লোভী বানিয়ে দিলেন, আমার এখন রিভিউ চাই এই গল্প নিয়ে।মনেপ্রাণে আশা করছি, আপনারা নিজ দায়িত্বে অন্যান্য গল্পপ্রেমী পাঠকদের কাছে আমার লেখা, আমার নাম ছড়িয়ে দিবেন। আমার গল্প জগতে আপনার পদচারণা আমাকে আনন্দিত করে সবসময়ই। ভালোবাসা মনের অন্তঃস্থল থেক❤️
পুরো গল্পে ‘প্রাপ্তবয়স্ক এলার্ট’ থাকবে। ভেবেচিন্তে পড়বেন। খামোকা ১৮+ সিন নিয়ে এই গল্পে কেউ নারাজ হবেন না। ভালোবাসা আবারো❤️
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ❤ | পর্ব ৩২ থেকে ৩৩ শেষ | Arrange Marriage | ভালোবাসার গল্প | রোমান্টিক গল্প | AduriPakhi এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।
