যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৩৫.
রাত পেরিয়ে নতুন ভোরের আগমন ঘটছে ধীরে ধীরে। এই ভোরের আগমন হওয়ার কথা ছিলো কোনো এক সুখকর বার্তা নিয়ে। কিন্তু তা আর হলো না। এই ভোর বড় অলুক্ষণে। এই অনবরত বর্ষণ খুব অলুক্ষণে। গতরাতে যে ব্যক্তি বিজয়ীর বেশে জনগণের সামনে বক্তব্য পেশ করেছিলো, আজ সেই একই ব্যক্তি একজন হেরে যাওয়া ব্যক্তির ন্যায় মেঝেতে মাথা নত করে বসে আছে। তার আশেপাশে কারো অস্তিত্বই সে অনুভব করতে পারছে না। সব মলিন লাগছে।
দূর হতে বেঞ্চিতে বসা আফজাল সাহেব ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। চোখের সামনে ছেলের এই অবস্থা তার সহ্য হচ্ছে না। উনার পাশে বসে থাকা মধুমিতা আশ্বাস দেওয়ার সুরে বলে উঠে,
“ আল্লাহ সহায় হবেন আব্বা। আপনি শক্ত থাকুন। আম্মাও পৃথাকে একা রেখে আসতে পারছে না। শোভনও এখানে উপস্থিত নেই। আপনি ভেঙে পড়লে দাদা, হুমায়ুন আংকেল আর তূর্য ভাইয়াকে কে সাহস জোগাবে বলুন? “
পুত্র বধূর কথা শুনে আফজাল সাহেব চোখ তুলে তার সামনের বেঞ্চিতে বসে থাকা হুমায়ুন রশীদ এবং তূর্যের দিকে তাকায়। হুমায়ুন রশীদের বেশ বিধ্বস্ত অবস্থা। তূর্যও গত মধ্যরাত হতে এখানে উপস্থিত। সবার সামনে না কাদলেও ছেলেটা যে আড়ালে নিজের একমাত্র বোনের জন্য অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে তা তার চেহারা দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।
আফজাল সাহেব আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকায়।
__________
গতরাতে পার্টি অফিসে বসে সকলের অভিনন্দন বার্তার জবাব দিতে ব্যস্ত পার্থর কাছে আচমকা জহিরের কল আসে। ফোনের স্ক্রিনে আচমকা জহিরের নাম দেখতেই পার্থর বুক ধক করে উঠে। সে ফোন রিসিভ করে কিছু বলবে তার আগেই অপরপাশ থেকে জহিরের চিৎকার ভেসে আসে,
“ ভাই, ভাবীর এক্সিডেন্ট হইসে। গ্রীন কেয়ার হসপিটালে নিয়ে যাইতেসি আমি। আপনি আসেন। “
ব্যস! এই তিনটি বাক্যই পার্থর পৃথিবী দুমড়ে মুচড়ে দেয়। সে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দৌড়ে পার্টি অফিস থেকে বের হয়। তার সাথে থাকা শামীম,আসিফ সহ বেশ কয়েকজন তার এই অবস্থা দেখে নিজে ড্রাইভ করে তাকে হসপিটালে নিয়ে আসে। হসপিটালে এসে এক্সিডেন্টের বর্ণনা শোনার পরই পার্থ ধপ করে এই ওটির রুমের সামনে বসে পড়ে। এরপর থেকে কারো সাথে কোনো বাক্য বিনিময় করে নি সে। অনুভূতিহীন পাথরের মূর্তির ন্যায় একইভাবে বসে আছে।
দীর্ঘ চার ঘন্টার অপেক্ষার পর ওটির বাহিরের রুমের দরজা খুলে। বেরিয়ে আসে একজন সার্জিক্যাল এপ্রোন পরিহিত মহিলা ডক্টর। তার পিছনে রয়েছেন একজন নার্স। পার্থ যেন কিছুটা শক্তি ফিরে পায়। ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে উঠে দাঁড়িয়ে ডক্টরের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না তার। সামান্য ছোট একটা প্রশ্ন করার সাহসটুকুও খুঁজে পাচ্ছে না সে। এগিয়ে আসে বাকিরাও। হুমায়ুন সাহেব বেশ আশা নিয়ে দুঃসাহসিক প্রশ্নটা করে বসে,
“ আমার মেয়েটা ঠিক আছে তো ডক্টর? “
ডক্টর ফারহানা নিরাশ গলায় প্রশ্ন করে,
“ আপনারা কি জানেন না? “
মধুমিতা ডক্টরের প্রশ্ন শুনে মনে মনে কিছু একটা আন্দাজ করে। গতরাত হতে সে এই বিষয়টা নিয়ে কারো সামনে মুখ খুলে নি। যেই ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয় সেই ব্যাপারে আশংকা করে সবার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার পক্ষে সে ছিল না। মধুমিতার ভাবনার মাঝেই হুমায়ুন রশীদ বলেন,
“ কি জানি না? আমার মেয়ে কেমন আছে? “
ডক্টর ফারহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“ এক্সিডেন্টের শিকার আপনার মেয়ে একা হয় নি। তার গর্ভে থাকা দুই মাসের আরেকটা প্রাণও এই এক্সিডেন্টের শিকার। কিন্তু নাজুক প্রাণটা এতো বড় ধাক্কা সামলাতে পারে নি। বাচ্চাটা আর নেই। “
মুহুর্তেই কান্নার তীব্রতা হু হু করে বেড়ে যায়। আফজাল সাহেবের মতো কঠিন একজন মানুষও নিজের কান্না দমিয়ে রাখতে পারে না। মধুমিতাও শব্দ করে কেদে উঠে।
পার্থর সম্পূর্ণ শরীর নিস্তেজ লাগছে। সে দুই পা পিছিয়ে যেতেই করিডোরের দেয়ালে গিয়ে তার পিঠ ঠেকে। তার তরী প্রেগন্যান্ট ছিলো? তার বাচ্চাটাকে ওরা বাঁচতে দিলো না? বাচ্চাটার কি দোষ ছিলো? তার তরী আর তার বাচ্চা তো নিষ্পাপ ছিলো। প্রশ্নগুলো পার্থর মস্তিষ্কে বেশ এলোমেলো ভঙ্গিতে উঁকি দেয়।
ডক্টর ফারহানা আবার হুমায়ুন রশীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
“ ডক্টর তরী কাল আমার কাছে এসেছিলো প্রেগন্যান্সি টেস্ট করাতে। আমার সামনে বসেই উনি বিকেলে নিজের রিপোর্ট দেখেছিলেন। খুশিতে আমার চেম্বারে বসে বেশ কিছুক্ষণ কেদেও ছিলেন। বারবার বলছিলেন আমি যেনো আপনাকে এই বিষয়ে না জানাই। উনি সবার আগে নিজের হাজবেন্ডকে এই গুড নিউজটা দিতে চায়। “
ডক্টর ফারহানার এক একটা কথা পার্থর কানে তীক্ষ্ণ ভাবে বারি খাচ্ছে। উনার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ পার্থর বুকে গিয়ে বিঁধছে। তূর্য ঢোক গিলে নিজের কান্নাটুকু দমিয়ে রেখে প্রশ্ন করে,
“ আমার আপি? হাও ইজ শি? আপি ঠিক আছে তো? “
“ আমাদের যতদূর যা করার ছিলো সবটা করেছি। উনার ইঞ্জুরি গুলো খুব সিরিয়াস। গাড়ি কয়েকবার ডিগবাজি খাওয়াতে মাথায় বেশ সিরিয়াস ইঞ্জুরি হয়েছে। ডান পায়েও হয়তো বেকায়দায় আঘাত পেয়েছে বেশ। ফ্র্যাকচার হয়ে গিয়েছে। পুরো শরীরে আরো অসংখ্য ইঞ্জুরি রয়েছে। উনাকে এখন আইসিইউতে শিফট করা হবে। আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে যেনো জ্ঞান ফিরে আসে সেই দোয়া করেন। নাহয় আমাদের আর কিছু করার নেই। “
আফজাল সাহেব, মধুমিতা ও তূর্য আবার বেঞ্চিতে বসে পড়ে। হুমায়ুন রশীদ ডক্টর ফারহানার সাথে তরীর ব্যাপারে কথা বলার জন্য তার কেবিনে চলে যায়। পার্থ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পরাস্তের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। তখনই আবার ওটির দরজা খুলে যায়। দরজার ভেতর থেকে একটা চাকা চালিত হসপিটাল বেড বেরিয়ে আসে। তিনজন ওয়ার্ড বয় এবং একজন নার্স সেই বেড নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বেডে শুয়ে থাকা মানবীর বুক পর্যন্ত একটা শুভ্র চাদর দ্বারা ঢাকা। সম্পূর্ণ মাথার অর্ধেকটাই ব্যান্ডেজ করা। আঘাত প্রাপ্ত একহাতে ক্যানেলাসহ আরো বিভিন্ন নাম না জিনিস লাগানো। বেডটা চোখের আড়াল হওয়ার আগেই পার্থ এক পলক সেই মানবীর মুখশ্রীর দিকে নিজের দৃষ্টি স্থির করে। গাড়ির ভাঙা কাঁচের সাথে লেগে তরীর ডান গালের বড় গভীর কাঁটাটা পার্থর চোখে বিঁধে। সে এলোমেলো কদম ফেলে বেডটার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে আসিফ ও শামীম এসে তাকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরে। আসিফ বলে,
“ ভাই যাইয়েন না। সহ্য করতে পারবেন না। “
পার্থ তাদের বাধা মানে না। ছোটার জন্য ছটফট করতে থাকে। কিন্তু ক্লান্ত শরীরে জোর না থাকায় পরাজিত হয়ে থেমে যায় সে। তার অসম্ভব লাল চোখ জোড়ায় জমে থাকা পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই হাতের উলটো পিঠের সাহায্যে তা মুছে নেয় সে। অত:পর বড় বড় কদম ফেলে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। আফজাল সাহেব ক্লান্ত গলায় আসিফ ও শামীমকে বলে,
“ ওকে একা ছেড়ো না। সাথে যাও। “
আসিফ আর শামীমও পার্থর পিছু পিছু চলে যায়।
__________
শান্ত শিষ্ট থানাটা সদ্য নির্বাচিত এমপির আগমনে গরম হয়ে যায়। সকলেই এগিয়ে আসে পার্থর দিকে তাকে বিভিন্ন শুভেচ্ছা বার্তা জানানোর জন্য। কিন্তু পার্থ সকলকে উপেক্ষা করে সোজা একটা রুমে প্রবেশ করে।
টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কনসটেবেলের সাথে কথা বলছিলো শোভন। আচমকা নিজের বড় ভাইয়ের আগমনে সে অবাক হয়। গতরাতে ভাবীর এক্সিডেন্টের খবরটা পাওয়ার পর সে সোজা এক্সিডেন্ট স্পটটা তে চলে যায়। এই কেসটা নিয়েই ইনভেস্টিগেশনে ব্যস্ত সে। তাই পার্থর সাথে আর তার দেখা হয় নি। কিন্তু এই মুহুর্তে নিজের ভাইকে এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে তার বেশ খারাপ লাগে। কিন্তু সেটা সে প্রকাশ করতে পারে না। চুপচাপ কনসটেবলকে চোখের ইশারায় বলে বেরিয়ে যেতে।
পার্থ এগিয়ে এসে শোভনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলে উঠে,
“ এই এক্সিডেন্টের সাথে রুবেল হোসেন জড়িত। ওকে বাসা থেকে তুলে আন। বাকিটা আমি দেখবো। “
শোভন ভাইকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে,
“ তুই ঠান্ডা হয়ে বস দাদা। “
পার্থ শান্ত হয় না। বরং আক্রোশে ফেটে পড়ে। চিৎকার করে উঠে,
“ আমার সন্তানের হত্যাকারীকে যদি তুই আমার হাতে না তুলে দিতে পারিস তাহলে আমি নিজে তাকে খুঁজে বের করবো। কিন্তু কোনো ভাবেই ও আমার থেকে রেহাই পাবে না। “
শোভন বিস্মিত হয়। অবাক সুরে প্রশ্ন করে,
“ তোর সন্তান মানে? “
“ আমার তরী প্রেগন্যান্ট ছিলো। ওই কুলাঙ্গার আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলেছে। আমার বউ ওর কারণে ক্রিটিকাল অবস্থায় আইসিইউতে পড়ে আছে। আমার ভেতরে যেই আগুন ও জ্বালিয়েছে সেই আগুন নিভানোর আগ পর্যন্ত আমি শান্ত হবো না। জানোয়ারের বাচ্চাকে আমি খুন করে ফেলবো। “
শেষের কথাটুকু বেশ হিংস্র ভঙ্গিতে বলে পার্থ। শোভন পার্থকে জোর করে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে তার সামনে একটা পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ আমি জানি রুবেল এর সাথে জড়িত। প্রমাণ পেয়েছি। “
পার্থ পানির গ্লাসটাকে উপেক্ষা করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। শোভন হাতের গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে শান্ত গলায় বলে,
“ যেই রোডে ভাবীর এক্সিডেন্ট হয়েছে তার কিছু দূরেই একটা খাদে সেই ট্রাকটাকে খুঁজে পাই আমরা। ট্রাকের ভেতর ড্রাইভারের সিটে আমরা রুবেলের লোক সুজনের ডেড বডি খুঁজে পাই। রুবেলের আদেশ মতেই হয়তো সুজন এই কাজটা করেছে। ভাগ্য খারাপ যে এক্সিডেন্ট স্পটে কোনো সিসিটিভি ছিলো না। তাহলে প্রমাণটা আরো পাকাপোক্ত হতো। কিন্তু তুই চিন্তা করিস না। আমি অলরেডি আমার লোক পাঠিয়েছি রুবেলকে ধরে আনার জন্য। “
সুজনের নাম শুনতেই পার্থ স্তব্ধ হয়ে যায়। তার সাহায্য করার প্রতিদান ছেলেটাকে নিজের জীবন দিয়ে চুকাতে হলো? রুবেল কি টের পেয়ে গিয়েছিলো যে সুজন তার হয়ে রুবেলের বিরুদ্ধে কাজ করছে?
__________
চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে রুবেল হোসেন। তার সম্পূর্ণ শরীর হতে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। রডের আঘাতে করা তার আর্তনাদ কাপিয়ে তুলছে সম্পূর্ণ আন্ডার কন্সট্রাক্টশন বিল্ডিংটা। দূর হতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এই নৃশংস দৃশ্য দেখছে শোভন, আসিফ ও শামীম।
পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে অমানবিক ভাবে একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে পার্থ। তার সম্পূর্ণ শরীর ঘেমে একাকার। ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবিটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। থেকে থেকে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। নিঃশ্বাস নেওয়ার দমকে তার বুক পিঠ কিছুক্ষণ পর পর ফুলে উঠছে। তবুও থামার কোনো নাম নেই। রড দিয়ে লাগাতার আঘাত করতে করতে পার্থ চেঁচিয়ে বলে উঠে,
“ শু*রের বাচ্চা, তোর শত্রুতা আমার সাথে। তোর প্রতিশোধ নেওয়ার হলে তুই আমার উপর নিতি। এই দ্বন্দ্বের ভেতর তুই আমার বউকে কেন টেনে আনলি? “
পার্থর কথা শুনে রুবেল আর্তনাদ থামিয়ে এবার গা কাপিয়ে হেসে উঠে। গা জ্বালানো সুরে বলে উঠে,
“ খুব বাড় বেড়েছিলো না তোর? তোকে আমি সতর্ক করেছিলাম আমার পিছনে না লেগে নিজের বউয়ের দিকে খেয়াল রাখতে। কিন্তু তুই আমার কথা শুনোস নাই। ওই সুজন কুত্তার বাচ্চার সাথে মিলে আমার পিছে হাত ধুয়ে পড়েছিলি। কি ভেবেছিলি? আমি জানতে পারবো না? মন তো চাচ্ছিলো তোর বউকে তুলে এনে গ্যাং রেপ করাই। যাতে কখনো আর মাথা উঁচু করে সমাজে দাঁড়াতে না পারোস। কিন্তু আমি তোর বউকে সহজ মৃত্যু ভিক্ষা দিয়েছি। তোর উচিত আমার কাছে শুকরিয়া আদায় করা। “
রুবেলের কথা যেনো পার্থর বুকের জ্বলন্ত আগুনে পেট্রোলের ন্যায় কাজ করে। বন্য জন্তুর ন্যায় ফুসে উঠে সে। সাথে সাথে হাতের রডটা ঢিল মেরে দূরে ফেলে দিয়ে চেয়ার সহ রুবেলকে এক লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। অত:পর রুবেলের উপর বসে সে বেসামাল ভঙ্গিতে এলোপাথাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। হিংস্র স্বরে বলে উঠে,
“ জানোয়ারের বাচ্চা তোকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না আজকে। তুই মরার আগে আমাকে শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দে। আমার বাচ্চাকে কেন মারলি তুই? আমার বাচ্চার কি দোষ ছিলো? কেন মারলি? “
প্রশ্নটুকু করে পার্থ জবাবের অপেক্ষা করে না। বরং একহাতে রুবেলের চুল মুঠি করে ধরে মেঝেতে তার মাথা জোরে জোরে ঠুকতে শুরু করে। রুবেলের মাথা ফেটে রক্ত বের হওয়া শুরু হয়। এই পর্যায়ে ব্যথাটা অসহনীয় ঠেকে তার কাছে। এতক্ষণের পৈশাচিক রূপ থেকে বেরিয়ে আচমকা আর্তনাদ করে উঠে,
“ ছেড়ে দে পার্থ মুন্তাসির। “
এই আর্তনাদ পার্থর কলিজা শান্ত করতে পারে না। সে এই আকুতি আরো শুনতে চায়। তাই লাগাতার এলোপাথাড়ি মারতে থাকে রুবেলকে। মুখে হিংস্র গলায় শুধায়,
“ তোকে ছাড়বো? তুই ছেড়েছিলি? আমার তরীকে? আমার বাচ্চাকে? তুই ওদের ছাড় দিয়েছিস? তোকে ছাড় দিলে আমার বাচ্চার আত্মাও কখনো শান্তি পাবে না। তোকে ছাড় দিলে আমার তরীর সাথে অন্যায় হবে। ছাড়বো না তোকে আমি। একটুও ছাড় পাবি না। “
কথাটুকু বলতে বলতে পার্থর দু'হাত থেমে যায়। সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। দু দন্ড জোরে নিঃশ্বাস নেয়। এক মুহুর্তের জন্য আঘাত থেকে মুক্তি পেয়ে রুবেল একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে নেয়। কিন্তু তার আগেই সে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠে। পার্থ তার গোপন অঙ্গে পরপর কয়েকটা জোরে লাথি মারে। এই পর্যায়ে শোভন দৌড়ে এসে ভাইকে দূরে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে বলে,
“ মরে যাবে দাদা। ছেড়ে দে। বাকি শাস্তিটুকু আইনের জন্য তোলা রাখ। “
শোভন একা ভাইকে আটকাতে পারছিলো না। পার্থর উপর যেনো দশটা জ্বিনের অলৌকিক শক্তি এসে ভর করেছে। সে হিংস্র স্বরে ফুসছে। আসিফ ও শামীমও এগিয়ে এসে শোভনের সাথে মিলে পার্থকে জাপ্টে ধরে পিছিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু তারা সকলেই পার্থকে আটকে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। শোভন পার্থকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
“ ভাবী অপেক্ষা করছে দাদা। এখানে আর সময় নষ্ট করিস না। তোর এই মুহুর্তে ভাবীর পাশে থাকা উচিত। “
শোভনের কথাটুকু যেন টনিকের মতো কাজ করে। হিংস্র পার্থ মুহুর্তেই শান্ত হয়ে যায়। তাকে শান্ত হতে দেখে শোভন, আসিফ আর শামীম তাকে ছেড়ে দেয়। পার্থ নিষ্প্রভ দৃষ্টি মেলে শোভনের দিকে তাকায়। শোভন আবার কোমল স্বরে বলে,
“ ভাবীর কাছে যা দাদা। “
পার্থ কোনো জবাব দেয় না। সে এক দৃষ্টিতে শোভনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আচমকা গান শুটের বিকট শব্দে শোভন, আসিফ ও শামীম কেপে উঠে। বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে তারা কিছুটা দূরে মেঝেতে পড়ে থাকা রুবেলের দিকে তাকায়। অত:পর তাকায় রুবেলের দিকে রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে থাকা পার্থর দিকে। পার্থ এখনো শোভনের দিকে তাকিয়ে আছে। শোভন বিস্ময় নিয়ে নিজের পকেট হাতড়ে নিজের রিভলবারটা খুঁজে। পার্থ তার অজান্তেই তার রিভলবার নিয়ে নিয়েছে বুঝতেই সে আরেক দফা অবাক হয়ে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকায়। পার্থ সাথে সাথে আরো কয়েকবার শুট করে। লোডেড রিভলবারের সবগুলো গুলি রুবেলের দেহে প্রবেশ করিয়ে তবেই সে ক্ষান্ত হয়। এখন তাকে দেখতে বেশ শান্ত লাগছে। চেহারার ভঙ্গিমা এমন যেন এইমাত্র সে কিছুই করে নি। রিভলবারটা এবার শোভনের হাতে দিয়ে পার্থ অতি শীতল গলায় বলে,
“ এখন আমি গিয়ে তরীর সামনে দাঁড়াতে পারবো। “
চলবে…
[ কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ]
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো | পর্ব - ৩৫ | ভালোবাসার গল্প | উপন্যাস এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।
