আমাদের চ্যানেলে ঘুরে আসবেন SUBSCRIBE

আদুরি পাখি ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম™

সম্মানিত ভিজিটর আসসালামুয়ালাইকুম : আমাদের এই ওয়েবসাইটে ভালোবাসার গল্প, কবিতা, মনের অব্যক্ত কথা সহ শিক্ষনীয় গল্প ইসলামিক গল্প সহ PDF বই পাবেন ইত্যাদি ।

  সর্বশেষ আপডেট দেখুন →

আমার গল্পের নায়িকা তুমি | ভালোবাসার গল্প | ছোট গল্প | অণুগল্প | Aduri Pakhi - আদুরি পাখি

ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প, ছোটগল্প, অনুগল্প, প্রেমের গল্প, Aduri Pakhi, আদুরি পাখি,
Please wait 0 seconds...
Scroll Down and click on Go to Link for destination
Congrats! Link is Generated
-আম সরি তন্ময়, আমি আর তোমার সাথে এই রিলেশনশিপ কন্টিনিউ করতে পারছিনা। আমি অনেক দিন আগে থেকেই তোমাকে এই কথাটি বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সাহস পাইনি। তবে আজ না বলে পারছিনা। অনেক ভেবে দেখেছি তোমার সাথে আমার যাচ্ছে না। 
Related Posts
স্মৃতির মুখে এমন অনাকাঙ্খিত কথায় হতবিহ্বল হয়ে গেল তন্ময়। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল সে। স্মৃতির এমন ফালতু মজা করার অভ্যাস আছে। আসতে দেরি হওয়ায় নিশ্চয় মেয়েটা তার মগজে এই কুবুদ্ধির উৎপত্তি করেছে। তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
--তোমার মনে হয়না তোমার এসব ট্রিকস এখন আউট ডেটেড হয়ে গেছে! ট্রাই সামথিং নিউ। মাথার কুবুদ্ধি গুলোকে একটু আপডেট করো। ব্যাকটেরিয়া ধরে গেছে। 

--আম নট জোকিং তন্ময়। আম সিরিয়াস। 

--সিরিয়াস হলে তো আইসিইউতে থাকতে। এখানে কি করছ?

স্মৃতি এবার রেগে গিয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বলল,
--আমি মজা করছিনা তন্ময়, কেন বুঝতে পারছোনা তুমি? আমি সত্যি সত্যিই এই সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই। আই ডোন্ট ওয়ান্ট দিস রিলেশনশিপ। আই ওয়ান্ট টু কুইট দিস। 

তন্ময়ের এবার মনোভাব পরিবর্তন হচ্ছে। কেমন ভয় লাগছে তার। তন্ময় শুকনো ঢোক গিলে কিছুটা রাগী স্বরে বলল,
--দেখ স্মৃতি তুমি কিন্তু এখন অতিরিক্ত করছ। বন্ধ করো এসব ফালতু মজা। এনাফ ইজ এনাফ নাউ।

--এক্সাক্টলি, দ্যাটস হোয়াট আম সেইং। এনাফ নাউ। আই কান্ট কন্টিনিউ দিস রিলেশনশিপ উইথ ইউ। 

তন্ময়ের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। তার পৃথিবীটা থমকে গেল মুহুর্তেই। পূর্ব দিক থেকে প্রবল বেগে ধেয়ে আসা কালবৈশাখী ঝড় এসে হামলে পড়লো হৃদবক্ষে। নিজেকে সামলে রাখার প্রচেষ্টা করে তন্ময় আহত স্বরে বলল,
--কী বলছ তুমি স্মৃতি? রিলেশনশিপ বন্ধ করতে চাও মানে কী? এটা কী কোন ইলেকট্রিক ডিভাইস নাকি যে, সুইচ অফ করলাম আর বন্ধ হয়ে গেল? হঠাৎ করে কী এমন হয়ে গেল তোমার যে, দেড় বছরের সম্পর্ক তোমার বন্ধ করার ইচ্ছে হলো? টেল মি ড্যাম ইট। 

স্মৃতিও দ্বিগুণ উত্তপ্ত হয়ে বলল,
--শুনতে চাও যখন শোনো তাহলে। সমস্যাটা হলো তোমার আমার আর্থিক স্ট্যাটাস। প্রথম প্রথম আবেগের বশে অতটা বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি। তোমার এই আর্থিক অপারগতা আমাকে কখনোই সুখী রাখতে পারবেনা। আমার সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হয়েছে। আমি চাওয়ার আগেই সবটা পেয়ে যাই। সেই আমি তোমার মতো একজন অনাথ, যার না নিজের ঠিকানা আছে আর না আছে কোনো দৌলত তার সাথে কীভাবে সারাজীবন কাটাবো? আই জাস্ট কান্ট। আমি তোমার সাথে সারাজীবন কম্প্রোমাইজ করে চলতে পারবোনা।তাই এই সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই আমি। 

তন্ময়ের হৃদপিণ্ডটা বুঝি কেউ দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে চিপে ধরেছে।র,ক্ত ক্ষরণের তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে তার। স্মৃতি এমন বিষাক্ত তীর কেন মারছে ওকে? ওর যে কষ্ট হচ্ছে তাকি বুঝতে পারছেনা স্মৃতি? ওর স্মৃতি তো এতো পাষাণ নয়। তবে কে এই পাষাণী? তন্ময় কম্পিত স্বরে বলল,
--দেখ স্মৃতি, তুমি চিন্তা করোনা। একবার গ্রাজুয়েশন টা শেষ হলে আমি নিশ্চয় ভালো কিছু করতে পারবো। আমার ওপর একটু আস্থা রাখ। দেইখো আমি সব ঠিক করে দিবো। শুধু আমাকে একটু সময় দাও। 

--আর যদি না পারো তখন? দেখ আমি আর এসব নিতে পারছিনা। এই সম্পর্ক এখন আমার কাছে জেলখানা মনে হচ্ছে। প্লিজ আমাকে এর থেকে মুক্তি দাও। স্বাধীন হতে চাই আমি। 

গলা চেপে ধরলো কেউ যেন। নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা তন্ময়। অস্থিরতায় ছটফট করছে। জানটা এখনই বোধহয় এখুনি বের হয়ে যাবে। ঠাস করে চোখের পাতা খুলে উঠে বসলো তন্ময়। বিছানায় দুই হাত রেখে জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে সে। সারা শরীর ঘেমে একাকার। বিছানার পাশে ক্যাবিনেটের ওপর থেকে পানির গ্লাস টা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। পানি খেয়ে হালকা স্বস্তি হলো তার। গত আট বছর যাবৎ এই একটা দুঃস্বপ্ন ওকে এক মুহুর্তের জন্যেও শান্তি দেয়না। একটা রাতও সে শান্তিমতো ঘুমুতে পারে না। স্মৃতির দেওয়া ওই ভয়ানক দুঃস্বপ্ন তার পিছু ছাড়ে না কখনো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তন্ময়। জানালার শুভ্র পর্দাগুলো দুই হাতে সরিয়ে দিতেই সকালের স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপসা এসে লাগলো চোখে মুখে। চোখ বুজে নিলো তন্ময়। আর সাথে সাথেই চোখের তারায় ভেসে উঠলো সেই হৃদমোহিনীর হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা। ঝট করে চোখ খুললো আবার। চোখ বন্ধ করেও শান্তি পায়না। নিদ্রা-জাগরণে সবখানেই যে সেই মানবী এসে উপস্থিত হয়। এতবছরেও কেন এক মুহুর্তের জন্যেও তাকে ভোলা যায় না? কেন এতো অপারগ সে? দরজায় নক পড়ার শব্দে ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এলো তন্ময়। দরজা খুলে দেখলো সার্ভেন্ট কফির ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সময় অনুযায়ী কফি নিয়ে এসেছে সে। তন্ময় কফির মগটা হাতে নিলো। সার্ভেন্ট বলল,
--স্যার আপনার জন্য নাস্তায় কী বানাবো?

--টোস্ট, অমলেট এন্ড স্যালাদ। 

--ওকে স্যার। 

সার্ভেন্ট চলে গেল। তন্ময় কফির কাফটা হাতে নিয়ে বেডরুমের পাশের বিশালকার খোলা বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। বেলকনির চারপাশে কাচের রেলিঙ। দেখতে ছোট আকারের ছাদের মতো। কফির মগে ঠোঁট চুবিয়ে বাইরের প্রকৃতিতে নজর দিলো তন্ময়। স্মৃতির সাথে বিচ্ছেদের আট বছর চলছে। এই আট বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন আর তন্ময় সেই আগের তন্ময় নেই। সে এখন দেশের একজন নামকরা আর্কিটেক্ট ইন্জিনিয়ার।গত তিনবছর ধরে সেরা আর্কিটেকচারের পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছে।  আজ "নেই" বলতে কোন জিনিস নেই তন্ময়ের কাছে। নাম-ডাক,বাড়ি-গাড়ী, অর্থ-প্রাচুর্য সবই ভরপুর। না, সে গল্প, সিনেমার মতো প্রেমিকার সাথে প্রতিশোধ বা তাকে দেখানোর জন্য এসব করেনি সে। নিজের মেধা,পরিশ্রম আর উপরওয়ালার আশীর্বাদে সে আজ এতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজ তার কাছে সব আছে। তবুও যে সে সর্বশূন্য। বুক জুড়ে তার শুধু হাহাকার। স্মৃতি যেতে যেতে ওর সব প্রশান্তি নিয়ে চলে গেছে। তবুও এতকিছুর পরও স্মৃতিকে সে ঘৃণা করতে পারে না। কোনক্রমেই পারে না। সে যে ওই নারীকে শুধু ভালোবাসতেই শিখেছে। নিজের সবটা দিয়ে তাকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই হয়না তার দ্বারা। 

স্মৃতির সেই যন্ত্রণাদায়ক কথাগুলো সবসময় কানে বাজে তার। আশ্চর্যের বিষয় হলো স্মৃতির সেদিনের সেই নেতিবাচক মনোভাবের ছিটেফোঁটাও আগে কখনো লক্ষ করেনি সে। স্মৃতি কখনো তার কাছে এমন কোনো ডিমান্ডও করেনি। কখনো ধনীর দুলালীর মতো কোনো প্রভাব দেখিয়েছে। নাকি আমিই দেখতে পাইনি? কই তার চোখে তো কখনো আমি আমার প্রতি কোনো অভিযোগ দেখিনি। লোকে বলে মানুষের মুখের ভাষা মিথ্যে হলেও চোখের ভাষা নাকি কখনো মিথ্যে বলেনা।  তবে কী স্মৃতি এতই নিখুঁত অভিনেত্রী ছিলো? নাকি আমিই অন্ধ ছিলাম? আমার কাছে তো মনে হতো তার চোখ এই দুনিয়ার সবচেয়ে স্বচ্ছ আর নিস্পাপ। ওই চোখে তাকালে প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় মন। সেই প্রথম দিনের মতোই। আষাঢ়ের প্রথম ফোঁটা কদমের মতোই সে এসেছিল আমার জীবনে। আমি তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার তেমন কোনো বন্ধু বান্ধব ছিলোনা। একা একাই থাকতে পছন্দ করতাম আমি। কিছুটা বইয়ে মুখ গুঁজে দুনিয়াদারি ভুলে থাকা ছেলেদের মতো। অনাথ হওয়ায় ছোট বেলা থেকেই একা থাকা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। সেদিনও একাই ক্যাম্পাসের এক কোনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে বইয়ে মুখ গুঁজে ছিলাম। হঠাৎ কানের কাছে মেয়েলী কন্ঠে কেউ বলে উঠলো। 
--এইযে শুনছেন মিঃ বিদ্যাসাগরের ডুবে যাওয়া টাইটানিক! 

এমন উদ্ভট কথা শুনে ভড়কে গেল তন্ময়। কপাল কুঁচকে মাথা তুলে সম্মুখের মানবীর দিকে তাকাতেই মেয়েটি সগর্বে বলে উঠলো। 
--হ্যাঁ আপনাকেই বলছি কানের ময়লা পরিষ্কার করে শুনুন, বারবার বলবোনা।কথাটা হলো, আই লাভ ইউ। 

তন্ময় টাস্কি খেয়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে।কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসা কাকটা তখনই কা কা করে ডেকে উঠলো। তন্ময় চোখের পাতা কয়েকবার পিটপিট করে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করলো। মেয়েটি এতো নির্দ্বিধায় ওকে আই লাভ বলল যেন সে ফুচকাওয়ালার কাছে এক্সট্রা টক চাইছে। তন্ময়ের তাকিয়ে থাকা দেখে স্মৃতি দায়সারা ভাবে বলল,
--আরে এভাবে উল্লুকের মতো তাকিয়ে থাকার দরকার নেই। ওইযে ওই সিনিয়র ভাইয়াগুলো বলেছে আপনাকে বলতে তাই বলেছি আই লাভ ইউ। এতো শক খেয়ে অক্কা পাওয়ার কিছু নেই। 

কিছুটা দূরে কয়েকটা ছেলেকে দেখিয়ে কথাটা বলল সে। তন্ময় বুঝতে পারলো মেয়েটাকে র্র্যাগ করছে সিনিয়র রা। তবে মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে না এই র্র্যাগ বিষয়টাতে তার কোনো ভয় বা জড়তা কাজ করছে। তাকে তো চরম প্রফুল্ল দেখা যাচ্ছে। র্র্যাগিংয়ের শিকার হয়েও যে কারও এতো ভালো লাগে তা আজ প্রথম দেখলো তন্ময়। মেয়েটির মুখে যেন রাজ্যের শুভ্রতা আর নিষ্পাপে ঘেরা। শত জনমের মায়া উপচে পড়ছে তার মুখমন্ডলে। তন্ময় চোখ নামিয়ে নিলো। ওই মুখে বেশিক্ষণ তাকালে ওর বাধ্য অনুভূতিরা অবাধ্য হবে। তবে তন্ময় কী আর জানতো এই মেয়েটা তার সর্বোস্বই অবাধ্য করে দিবে। পরদিন ক্যাম্পাসে হঠাৎ স্মৃতি তন্ময়ের পাশে এসে ধপ করে বসে পড়ে নির্দ্বিধায় বলে ওঠে। 
--চলুন কফি খাবো। 

তন্ময় আশ্চর্যজনক চাহুনি দিয়ে বলে। 
--তো আমাকে কেন বলছ?

স্মৃতির সোজাসাপটা উত্তর। 
--ওমা, তো কাকে বলবো? আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড, তো আপনাকেই তো বলবো।  

তন্ময় আকাশ থেকে যেন টুপ করে পড়লো। বিস্মিত কন্ঠে বলল,
--হোয়াট? বয়ফ্রেন্ড? কে বয়ফ্রেন্ড? আম কীভাবে তোমার বয়ফ্রেন্ড হোলাম?

--ওমা, গাজনী হয়ে গেছেন নাকি? কালই তো আই লাভ ইউ বললাম। আর আজই ভুলে গেলেন? 

--কিন্তু ওটাতো র্র্যাগিং ছিলো।

--সে যাইহোক। আমি মন মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম জীবনে যাকে আই লাভ ইউ বলবো সেই হবে আমার মনের মানুষ। আমার প্রানেশ্বর। আর আপনাকে যখন আই লাভ ইউ বলেছি তাই আপনিই এখন থেকে আমার বয়ফ্রেন্ড আর ভবিষ্যত স্বামী। এখন চলুন তো। খালি বকবক করেন আপনি। এতো কথা বলা লোক আমার একদম পছন্দ না। আমার মতো মিতভাষী হবেন। 
তন্ময়কে কিছু বলতে না দিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল স্মৃতি। তন্ময় হতবিহবল হয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো। 

এভাবে দেখতে দেখতে স্মৃতি সত্যি করেই তন্ময়ের সবকিছু অবাধ্য করে দিলো। তন্ময়কে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তার আবহে। কখন যে স্মৃতি তন্ময়ের সবটা কব্জা করে নিলো তা জানলও না তন্ময়। স্মৃতি মেয়েটাই এমন ছিলো, ওকে কেউ ভালো না বেসে থাকবে কী করে। তন্ময়ও পারেনি। স্মৃতি বাকিদের মতো ছিলো না। মেয়েটা ছিলো খুবই অন্যরকম। ও বাকিদের মতো এতো ন্যাকামো করতোনা। না রাত ভরে চ্যাট করতো, না এটা ওটার আবদার করতো। তবে মাঝে মধ্যে এমন এমন অদ্ভুত আবদার করতো যা পূরণ করতে তন্ময়ের রফাদফা হয়ে যেত। এই যেমন, তন্ময় একবার স্মৃতিকে চুমু খেতে চাইলো তখন স্মৃতি বলল,হ্যাঁ সে চুমু খাবে। তবে তার প্রথম চুমু হবে একেবারে অন্যরকম। যাকে বলে ঐতিহাসিক,একেবারে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণ অক্ষরে লেখা হবে এমন। তন্ময় তার প্ল্যান জানতে চাইলে বলল, সে মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো শীতে পাতলা সিল্কের শাড়ি পরবে আর তন্ময়কেও পাতলা শার্ট পড়তে হবে । তারপর দুজন মধ্য রাতের নিস্তব্ধতায় বাইরে বের হবে। তারপর রিকশায় উঠে ঘুরবে।ঠান্ডা হিমশীতল বাতাসে যখন ঠোঁট দুটো নীল হয়ে যাবে ঠিক তখনই হলো আমাদের প্রথম চুমুর সঠিক মোহরত। স্মৃতির এই চুমুর পরিকল্পনা শুনে বেচারা তন্ময় বলেছিল, তা এতরাতে কোন রিকশাওয়ালা আসবে শুনি? স্মৃতির জবাব, রিকশাওয়ালা কেন আসবে? রিকশাতো তুমি চালাবে। ব্যাস আর কি, তন্ময় আজও সে রাতের কথা ভুলতে পারে না।সত্যিই একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিলো সেটা। 

স্মৃতি বাকিদের মতো রোজ বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বা দেখা করতে কখনো জেদ করতোনা। তবে তার যখন মনে উদয় হয় তন্ময়কে দেখার তখন আর তাকে ঠেকানো যাবে না। তন্ময় তখন যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন স্মৃতির সাথে দেখা করতেই হবে। নাহলে স্মৃতির ভাষ্যমতে সে নাকি তখন নিঃশ্বাস নিতে পারে না। একবার তার এমনই আমাকে দেখার ইচ্ছে হয়। তো আমার ফোন বন্ধ পেয়ে সে সোজা আমার হলে চলে আসে। ছেলেদের হলে একটা মেয়েকে সবাই হতবাক হয়ে যায়। যারা জাঙ্গিয়া পরে ঘুরছিল তারা পরিমরি করে দৌড়ে পালিয়ে নিজেদের ইজ্জত বাঁচায়। একবার স্মৃতি বলল,সেদিন নাকি কেউ ওকে র্র্যাগ করেনি। আসলে আমাকে দেখেই তার লাভ এ্যাট ফাস্ট সাইড টাইপ হয়ে গিয়েছিল। তাই সে সেদিন আই লাভ ইউ বলেছিলো। আচ্ছা স্মৃতি তো বলেছিলো আমাকে না দেখলে নাকি ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে এখন কী তার নিঃশ্বাস বন্ধ হচ্ছে না?  নাকি সেসবও শুধু মিথ্যে ছিলো? কেউ কী এতোটাই নিখুঁত অবিনয় করতে পারে?  মাঝে মধ্যে খুব করে মন চায় স্মৃতির সামনে যেতে। না, নিজের সফলতা দেখানোর জন্য না। তন্ময় এতটাও ছোট মনের মানুষ না। বরং তাকে ফিরে পাবার একটা নিষিদ্ধ চাওয়া পূরণ করতে যেতে চায়। আমার সফলতা দেখে যদি স্মৃতি ফিরে আসে সেই ক্ষিণ আশায় যেতে চায়। তবে যাবে কী করে? সেতো জানেই না স্মৃতি কোথায়। স্মৃতি ওর সেই আগের বাড়িতে আর থাকে না। ওর নাম্বারটাও বদলে ফেলেছে। মোটকথা স্মৃতি একেবারে ওর জীবন থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছে। এতদিনে হয়তো সে কারোর....। নাহ এই ভাবনা টা ভাবতেও গলা চেপে ধরে ওর।  
__

স্মৃতিচারণ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে তন্ময়।  কফি শেষ করে শাওয়ার নিয়ে ব্ল্যাক কালারের সুট প্যান্ট পরে রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে এলো তন্ময়। বিশাল লম্বা ডাইনিং টেবিলে খাবার খাওয়া সদস্য শুধু সে একাই। এতোবড়ো বাড়ির সদস্যও যে একাই শুধু। খাওয়া শেষে কাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো সে। আজ চট্টগ্রাম যেতে হবে তাকে। ওখানে একটা প্রজেক্ট ডিজিইন করতে হবে ওকে। এয়ারপোর্টে থেকে প্লেনে যাবে। 

চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে গন্তব্য স্থলে যাচ্ছিলো তন্ময়। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে গাড়ি ব্রেক করায় তন্ময় সামনের দিকে ঝুঁকে পরে। ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলে, 
--কী হয়েছে। এভাবো গাড়ী থামালেন কেন?

--স্যার সামনে কোথাথেকে যেন একটা মেয়ে চলে এসেছে। গাড়ী না ব্রেক করলে এক্সিডেন্ট হয়ে যেত। 

--হোয়াট? মেয়টা ঠিক আছে তো? 

--কী জানি, দেখতে হবে।

--আচ্ছা আমি দেখছি।
তন্ময় গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে গাড়ির সামনে রাস্তায় বসে আছে। হাতে ব্যাথা পেয়েছে হয়তো তাই হাত ঘসছে। উল্টো দিকে থাকায় মুখ দেখা যাচ্ছে না। তন্ময় মেয়েটির কাছে গিয়ে বলল,
--আপনি ঠিক আছেন? 

মেয়েটি এবার মাথা তুলে তাকালো তন্ময়ের দিকে। স্থির হয়ে গেল তন্ময় সেই মুখপানে তাকিয়ে। হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। সে যা দেখছে তাকি সত্যি? নাকি দিবাস্বপ্ন দেখছে সে? হ্যাঁ তাই হবে। চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাকিয়ে নিজের ভ্রম দূর করার চেষ্টা করলো সে। নাহ, আবারও সে একই মুখ দেখছে। তবে কী স্মৃতি সত্যিই এখানে? আকুলতা ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো স্মৃতির পানে। গলা কাঁপছে তার। মনে হচ্ছে কান্না পাচ্ছে। এই মাঝ রাস্তায় ছেলে মানুষ হয়ে কাদাটা কী ঠিক হবে? গলার মাঝে দলা পাকা কান্না টা গিলে নিয়ে হাঁটু গেড়ে ধপ করে বসে পড়লো তন্ময়।  কম্পিত স্বরে সে বলে উঠলো। 
--স্মৃতি!! 

--আমার নাম কী করে জানলেন আপনি? আপনি চিনেন আমাকে?

স্মৃতির এমন প্রতিত্তোরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল তন্ময়। এমন কিছু সে মোটেও আশা করেনি। সেকি ইচ্ছে করে এসব বলছে? 
--এখন কী আমাকে চিনতেও পারছনা তুমি? এতটাই চক্ষুশূল হয়ে গেছি?

--মানে? আপনি কী চিনেন আমাকে? আচ্ছা তাহলে বলুন না আমার বাসা কোথায়? আমি আমার বাসা খুঁজে পাচ্ছি না। 

এবার আরও বিস্মিত হয়ে গেল তন্ময়। কী বলছে এসব স্মৃতি? সেকি সত্যিই চিনতে পারছেনা আমাকে? নাকি এটা অন্য কেউ? 
তখনই হঠাৎ মধ্যবয়স্ক একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ওখানে। স্মৃতিকে ধরে বলল,
--স্মৃতি মা,তুই এখানে কীভাবে এলি? আমি তোকে খুঁজে খুঁজে পাগল হয়ে গেছিলাম। তোকে না বলেছি একা একা কোথাও যাবিনা। চল বাড়ি যাই। 
স্মৃতিকে ধরে নিয়ে যেতে লাগলো ওর বাবা। তন্ময় এখনো ওভাবেই থমকে বসে আছে। সব কেমন অদ্ভুত লাগছে ওর কাছে। লোকটার কথায় বোঝা যাচ্ছে এটাই স্মৃতি। আর লোকটা স্মৃতির বাবা। তন্ময় ফট করে উঠে দাঁড়িয়ে স্মৃতির বাবার উদ্দেশ্যে বলল, 
--আঙ্কেল দাঁড়ান। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। 

স্মৃতির বাবা তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল,
--ঠিক আছে, আমার সাথে এসো।
___

সামনাসামনি সোফায় বসে আছে স্মৃতির বাবা আর তন্ময়। স্মৃতির বাবা বলতে আরম্ভ করলো।
--আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। স্মৃতি আমাকে তোমার ছবি দেখিয়েছিল। তুমিই তন্ময় তাইনা?

--জি আঙ্কেল। কিন্তু স্মৃতির কী হয়েছে? ও এমন অদ্ভুত কেন বিহেব করছে? 

স্মৃতির বাবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মলিন কন্ঠে বলল,
--আসলে স্মৃতির "আল্জ্হেইমার"(Alzheimer’s) রোগ হয়েছে । এই রোগে আক্রান্ত রুগী ধীরে ধীরে সব ভুলে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ছোট মোট জিনিস ভুলে যায়। তবে ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলতে শুরু করে। স্মৃতির এই রোগ ধরা পড়ে আট বছর আগে।তখন স্মৃতি মাঝে মধ্যেই এটা সেটা ভুলে যেত। তবে আমরা এতে অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে পারিনি। একদিন হঠাৎ বাসায় আসতে নিলে ও নিজের বাড়ির ঠিকানাই ভুলে যায়। অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারেনা ও। তখন আমাকে ফোন দেয়। সেদিন প্রথম আমার সন্দেহ হয়। আমি ওকে নিউরোলজিস্টের কাছে নিয়ে যাই। তখন ডাক্তার ওর এই রোগের কথা বলে। এটা শুনে স্মৃতি অনেক ভেঙে পড়ে। ও জেদ ধরে ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য। ওর কথামতোই এখানে চট্টগ্রামে চলে আসি আমরা। অনেক চিকিৎসা করিয়েও তেমন কোন সুফল পাইনি। স্মৃতির অবস্থা দিনকে দিন আরও অবনতি হয়েছে। সে এখন প্রায় জিনিসই ভুলে গেছে। মাঝে মধ্যে তো নিজের নামই ভুলে যায়। শুধু আমাকে আর ওর মাকে ছাড়া আর কাউকেই মনে নেই ওর। নাজানি কখন আমাদেরও ভুলে যায় ও। 

কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে উঠলো স্মৃতির বাবা। সব শুনে তন্ময় যেন অনুভূতি শূন্য পাথরের মতো হয়ে গেল। স্মৃতি যে ওকে সেদিন মিথ্যে বলেছিল তা ভালোই বুঝতে পারছে সে। আমাকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিতেই মেয়েটা ওসব বলেছিল। তবে কী স্মৃতি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছে? তন্ময় বলে উঠলো। 
--আঙ্কেল, আমি একটু ওর সাথে কথা বলতে চাই।

--ঠিক আছে, ওর রুমে গিয়ে কথা বলো। 

স্মৃতির রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখলো স্মৃতি জানালায় মাথা ঠেকিয়ে মলিন মুখে বাইরে তাকিয়ে আছে। বুকের ভেতর হু হু করে উঠলো তন্ময়ের। নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল স্মৃতির কাছে। মায়া ভরা কন্ঠে ডাকলো তাকে।স্মৃতি ফিরে তাকিয়ে তন্ময়কে দেখে বলল,
--আপনি? এখানে কী করছেন? আর কে আপনি?

তন্ময় অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
--তো তুমি আমাকে চিনো না তাইনা? ওকে ফাইন। 
তন্ময় টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাস টা সজোরে হাতে চেপে ধরলো। ফলস্বরূপ গ্লাস ভেঙে কাচের টুকরো হাতে লেগে হাত থেকে গলগল করে র,ক্ত বের হতে লাগলো। ঠিক তখনই স্মৃতি আৎকে উঠে চিৎকার করে বলল,
--তন্ময়য়য়য়....কী করলে এটা? পাগল হয়ে গেছ তুমি? হাত কেটে গেল। কত র,ক্ত বের হচ্ছে। কী করবো আমি? 
স্মৃতি তন্ময়ের হাত ধরে পাগলের মতো প্রলাপ করতে লাগলো। তন্ময়ের ঠোঁটে প্রাপ্তির হাসি। সে জানতো ওর স্মৃতি ওকে কখনোই ভুলতে পারে না। তন্ময় ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে বলল,
--আচ্ছা তো তুমি আমাকে চিনোনা তাইনা? তাহলে আমার নামটা বুঝি বটগাছের পেত্নী এসে বলে গেছে তাইনা?

স্মৃতি চমকে তাকালো তন্ময়ের পানে। চোখে চোখ পড়তেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলোনা সে। তন্ময়ের বুকে ঝেঁপে পরে হু হু করে কেঁদে উঠলো। তন্ময়ও বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো স্মৃতিকে। অভিমানী সুরে বলল,
--আই হেট ইউ স্মৃতি,আই হেট ইউ। তুমি এতো স্বার্থপর কীভাবে হয়ে গেলে? আমিতো তোমার সুখের সঙ্গী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমিতো আমাকে তোমার দুঃখের সাথী ভাবারও যোগ্য মনে করোনি।

স্মৃতি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
--কী করতাম, আমার এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে তোমাকে কীভাবে জড়িয়ে নিতাম।আমি  যে সব ভুলে যাই তন্ময়। আমার নাম স্মৃতি, অথচ নিজের স্মৃতিই ধরে রাখতে পারিনা।ভয় পেয়েছিলাম,  যদি কখনো তোমাকে ভুলে যাই। তাইতো তোমার কাছ থেকে ওভাবে পালিয়ে এসেছিলাম। আমিযে সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলছি তন্ময়। 

স্মৃতিকে বুক থেকে সরিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো তন্ময়। স্মৃতির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাতে চুমু খেয়ে বলল,
--আমি জানতাম তুমি আমাকে কখনোই ভুলতে পারবেনা। সব ভুলে গেলেও আমাকে তুমি ভুলবেনা। আর হ্যাঁ, রইলো ভুলে যাওয়ার কথা। তাতে কী হয়েছে? এখন থেকে আমরা রোজ নতুন স্মৃতি গড়বো। তুমি আগের স্মৃতি ভুলে যাবে। আমি রোজ তোমার জন্য নতুন স্মৃতি তৈরি করবো। রোজ নতুন ভোরের আলো ফুটবে। রোজ নতুন একটা গল্প লেখা হবে। হবে কী আমার গল্পের নায়িকা তুমি? 

স্মৃতি মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বুঝালো। তন্ময় জড়িয়ে নিলো প্রিয়তমাকে বুক পিঞ্জরে।

------সমাপ্ত 

আমার গল্পের নায়িকা তুমি 
মেহরুমা নূর

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমার গল্পের নায়িকা তুমি | ভালোবাসার গল্প | ছোট গল্প | অণুগল্প | Aduri Pakhi - আদুরি পাখি এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।

إرسال تعليق

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.
A+
A-
দুঃখিত লেখা কপি করার অনুমতি নাই😔, শুধুমাত্র শেয়ার করতে পারবেন 🥰 ধন্যবাদান্তে- আদুরি পাখি