যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২৮.
চট্টগ্রামে পার্থ এবং তরীর সেই অল্প দিনের স্থায়িত্ব ফুরিয়ে আসে খুব তাড়াতাড়িই। তারা ফিরে আসে ঢাকায়। এতোদিন পর ছেলে এবং ছেলের বউ ঘরে ফিরে আসায় নিষ্প্রাণ ঘর আবার প্রাণ ফিরে পায়। আফজাল চৌধুরী এবং সাদিকা বেগম তাদের ছেলে এবং ছেলে বউয়ের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্কের আভাস উপলব্ধি করে। খুশি হয় দু'জনই।
পার্থ নিজের নির্বাচনের প্রস্তুতি বেশ তোড়জোড় করেই নেওয়া শুরু করেছে। তরী ফিরে গিয়েছে নিজের প্রফেশনে। দেখতে দেখতে বিশটা দিন চোখের পলকেই পেরিয়ে যায়। সামনের সপ্তাহে শোভন এবং মধুমিতার বিয়ে। বাড়ি জুড়ে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে।
আজ ওপিডি ডে থাকায় দুপুরের মধ্যেই সব পেশেন্ট দেখে বাসায় ফিরে আসে তরী। বাসায় ফিরতেই দেখে তার দুই মামী শাশুড়ী লিভিং রুমে বসে। সাদিকা বেগমও তাদের বিকেলের চা নাস্তার আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত। তরী তাদের দেখেই এগিয়ে গিয়ে সালাম দেয়।
পথে চল্লিশ মিনিট এই তপ্ত আবহাওয়ায় জ্যামে বসে থাকার দরুন তরীর মুখশ্রীর রঙ কিছুটা ফ্যাকাসে লাগছিলো। তা দেখেই পার্থর ছোট মামী খোঁচা মেরে বলে উঠে,
“ আপা? ছেলের বউয়ের গায়ের রঙ দেখি একমাসেই ময়লা হয়ে গেছে। এই ছিলো আমাদের পার্থর পছন্দ? “
তরীর নিজের ব্যাপারে এরকম অহেতুক একটা কমেন্ট পছন্দ হয় না। সে হাসিমুখে একটা পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে একটা পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে আসে,
“ ঘরের মেয়েকে নিয়ে এরকম অহেতুক মন্তব্য আমার পছন্দ নয় পার্থর আম্মা। ভাবীরা হয়তো বিষয়টা জানে না। “
আফজাল সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতেই পার্থর ছোট মামীর মুখ কালো হয়ে যায়। উনি আর কিছু বলার সাহস রাখে না। তরী শশুড়ের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি দিতেই আফজাল সাহেব হাতের টুপিটা মাথায় দিতে দিতে বলে উঠে,
“ আমি মসজিদে যাচ্ছি নামাজের জন্য। তরী আম্মু তুমি উপরে গিয়ে বিশ্রাম করো। ক্লান্ত দেখাচ্ছে। “
তরী আফজাল সাহেবের পিছু পিছু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে বলে উঠে,
“ সাবধানে যাবেন আব্বা। “
আফজাল সাহেব মৃদু হেসে বেরিয়ে যায়। তরীও আসছি বলে উপরে নিজের রুমে চলে যায়। ঘরের বউকে এতো মাথায় তুলে রাখার বিষয়টা ছোট মামীর পছন্দ হয় না। যেই বউ কিনা সারাদিন ঘরের বাইরে কাটায়, সংসারের কোনো দায়িত্ব পালন করে না, তাকে এতো গুরুত্ব দেওয়ার কি আছে? এর থেকে হাজার গুণ ভালো তো তার মেয়ে শর্মী ছিলো। পার্থর যে কি বুঝে শর্মীর মতো সংসারী মেয়েকে রেখে তরীর মতো এমন উড়নচণ্ডী মেয়ে ভালো লাগলো তা মাথায় ধরে না উনার৷
__________
নিজের রুমের দরজার সামনে আসতেই তরীর ভ্রু কুচকে যায়। দরজা ভিতর থেকে মৃূদু চাপিয়ে রাখা হয়েছে। তরীর জানামতে পার্থ এই মুহুর্তে বাসায় নেই। আর বাড়ির অন্য কেউও তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের রুমে প্রবেশ করে না। তাহলে ভিতরে কে?
প্রশ্নটা মাথায় উঁকি দিতেই তরী নীরবে দরজা খুলে সিটিং এরিয়া পেরিয়ে বেডরুমে প্রবেশ করে। সাথে সাথে সে দেখতে পায় একটা বিরক্তিকর দৃশ্য। সকালে বেরোনোর আগে পার্থ নিজের গায়ের টি শার্ট খুলে একটা শার্ট পড়ে বেরিয়েছে। সেই টি শার্ট হাতে নিয়েই শর্মী তার আর পার্থর বেডে বসে আছে। বিরক্তিকর দৃশ্যটা দেখতেই তরীর পায়ের রক্ত মাথায় উঠে। সে ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠে,
“ অন্য কারো রুমে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে একজন বিবাহিত পুরুষের টি শার্ট হাতে নিয়ে বসে থাকাটা কোনো ভদ্র মেয়ের কাজ নয়। “
তরীর কণ্ঠস্বর শুনতেই শর্মী চকিতে পিছনে ফিরে তাকায়। তরী ব্যতীত অন্য কাউকে না দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। অত:পর মৃদু হেসে বলে উঠে,
“ পার্থ ভাইয়ের বিয়ে করে লাভ হলো কি? তার টি শার্টটাও তার বউ গুছিয়ে রাখতে পারে না। অবহেলায় রুমের এককোণে পড়ে রয়। “
শর্মী নামক এই মেয়েটাকে বিয়ের সময় দেখেছিলো তরী। তাদের বিয়ের পর একবার বাসায়ও এসেছিলো। আর এসেই সর্বক্ষণ পার্থর ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতো। তখনই তরী বুঝতে পেরেছিলো শর্মীর মনের খবর। সে শর্মীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠে,
“ পার্থর চিন্তা করার জন্য তার বউ আছে শর্মী। তোমার নিজের ভাইকে নিয়ে এতো চিন্তা না করলেও চলবে। “
তরীর বলা ‘ তোমার ভাই ‘ কথাটাটুকু শুনে শর্মীর গা জ্বলে যায়। তরী যে ইচ্ছে করে তাকে জ্বালানোর জন্যই এই কথাটা বলেছে তা বুঝতে বাকি থাকে না তার। কপট রাগ দেখিয়েই বেরিয়ে যায় সে।
শর্মীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তরী। জীবনের পথে বহু কাঁটাই থাকবে। বিশ বছরের বোকা তরী হলে এখন ঠিকই এই কাঁটার উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে পায়ে জখম বানাতো। কিন্তু এখন সে আর বোকা নয়। পথে কাঁটা পেলে সেই কাঁটা তুলে তবেই সেই পথে হাঁটে সে। এরকম বিবাহিত পুরুষের দিকে নজর দেওয়া মেয়েদেরকে দু চারটা কঠিন কথা শুনালে কোনো ক্ষতি নেই।
__________
রাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে শা শা বেগে হাইওয়েতে ছুটে চলেছে একটা বাইক। বাইকের সামনে টি শার্টের উপর জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে বসে বাইক চালাচ্ছে একটা শ্যামবর্ণের যুবক। পিছন থেকে তার পেট জড়িয়ে বসে আছে এক স্নিগ্ধ রমণী। তার মাথা ঠেকে আছে যুবকের পিঠে। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য প্রণয়ে আসক্ত এক প্রেমিক যুগল।
আচমকা রমণী উৎফুল্ল গলায় বলে উঠে,
“ তূর্য থামুন। “
তূর্য প্রশ্ন করে,
“ কি হয়েছে? “
“ ভূট্টা। “
তূর্য সাথে সাথে বাইক ব্রেক করে থামায় রাস্তার একপাশে। তার বাইক থামাতে দেরি কিন্তু পৃথার নেমে দৌড়ে রাস্তার অপরপাশে থাকা ভূট্টাওয়ালার ভ্যানের কাছে যেতে দেরি হয় না। তূর্য নিজের মাথার হেলমেটটা খুলে বাইকের চাবি পকেটে নিয়ে পৃথার পিছুপিছু আসে। তাড়াহুড়ো করে পৃথা নিজের মাথার হেলমেটও খুলে আসে নি। তূর্য এগিয়ে এসে আগে পৃথার মাথা থেকে হেলমেট খুলে অত:পর সামনের বৃদ্ধ লোকটার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
“ মামা একটা ভূট্টা দেন। “
লোকটা সাথে সাথে একটা ভূট্টার খোসা ছাড়িয়ে তা কয়লার উপরে দেয়। পৃথা চোখ বাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ একটা কেনো? আপনি খাবেন না? “
“ না। “
বলে তূর্য পৃথার এলোমেলো চুল নিজের হাতের সাহায্যে ঠিক করতে থাকে। বৃদ্ধ লোকটা আবার প্রশ্ন করে,
“ লেবুর টক দিবো নাকি তেঁতুলের? “
পৃথা সাথে সাথে জবাব দেয়,
“ তেঁতুলের। “
পত্রিকার কাগজে মোড়ানো কয়লায় পোড়া ভূট্টা হাতে নিয়ে টাকা মিটিয়ে দু'জনে বাইকের কাছে এসে দাঁড়ায়। পৃথা বাইকের উপর একপাশ হয়ে উঠে বসে। তূর্য তার সামনে দাঁড়িয়ে আশেপাশের রাস্তার দিকে দৃষ্টি বুলাতে থাকে। পৃথা ভূট্টায় একটা কামড় বসিয়ে ফুলে থাকা গাল নিয়ে প্রশ্ন করে,
“ বাই দ্যা ওয়ে, আজকে কোন খুশিতে আমাকে নিয়ে এই মাঝরাতে বাইক ড্রাইভে বেড়িয়েছেন? “
তূর্য পৃথার দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“ মেডিক্যাল এডমিশন টেস্ট দিয়েছো আজকে। সেই খুশিতে। “
পৃথা চোখ সরু করে বলে,
“ শুধু তো এডমিশন টেস্টই দিলাম। এতে সেলিব্রেশনের কি আছে? রেজাল্ট দেক আগে। “
“ পড়াশোনা করে টেস্ট দিয়েছো এটাই বা কম কিসে? আপাতত এটা সেলিব্রেট করি। টিকে গেলে আরেকবার সেলিব্রেশন করবো। “
তূর্যর কথাটা পৃথার পছন্দ হয়। সে ভূট্টা তূর্যর দিকে এগিয়ে ধরে। তূর্য প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই বলে,
“ আমি একা পুরোটা কিভাবে খাবো? রাক্ষস নাকি আমি? বাকিটা আপনি শেষ করেন। “
তূর্য হেসে বলে,
“ জানতাম। এজন্যই একটা নিয়েছি। “
পৃথা তূর্যের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসে। পৃথার সকল অভ্যাস পৃথার থেকেও ভালো এই মানুষটা জানে। এই মানুষ তার সাথে থাকতে তার কোনো চিন্তা নেই।
__________
সকাল সকাল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে চুল আছড়াতে ব্যস্ত তরী। তার পিছনে দাঁড়িয়ে পার্থ নিজের স্কিন কেয়ার নিয়ে ব্যস্ত। সেই দৃশ্যটা সরু চোখে দেখছে তরী। সে নিজে মেয়ে হয়েও আলসেমি করে কখনো স্কিন কেয়ার করার ধৈর্য্য কুলিয়ে উঠতে পারে না। অথচ পার্থর এইসব ব্যাপারে খুব ধৈর্য্য। সেল্ফ পেম্পারে এই লোককে কেউ হারাতে পারবে না।
পার্থ আয়নার দিকে নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে বলে উঠে,
“ আপনি যদি নেক্সট পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে দৃষ্টি না ফেরান তাহলে আজ আপনারও হসপিটালে যাওয়া হবে না আর আমারও সমাবেশে যাওয়া হবে না। “
তরী সাথে সাথে নিজের দৃষ্টি নত করে। এই লোকের ভরসা নেই। পার্থ মৃদু হেসে মেনস পারফিউম গায়ে মেখে হাতে হাতঘড়ি পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তরীও ততক্ষণে রেডি হয়ে ব্যাগ কাধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বেরিয়ে যেতে নিলেই পার্থ তাকে হাত ধরে টেনে থামিয়ে দেয়। তরী ফিরে তাকাতেই তার মোমের মতো গালে নিজের ওষ্ঠদ্বয় চেপে ধরে পার্থ। নরম গালটা ছুঁয়ে দিয়েই পার্থ গভীর স্বরে বলে,
“ আজকে ফিরতে হয়তো দেরি হবে। টায়ার্ড লাগলে অপেক্ষা করবেন না। ঘুমিয়ে পড়বেন। সকালে উঠে আমাকে পাশে পাবেন। “
তরী পার্থর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে উঠে,
“ সাবধানে থাকবেন। সাবধানে ফিরবেন। “
__________
সবেমাত্র একটা সার্জারি সেরে বেড়িয়েছে তরী। দুপুর বাজে একটা। সকালে হসপিটালে আসার পর থেকে এখনো পার্থর সাথে কথা হয়নি তার। বেশ অস্থির লাগছে। তাই লাঞ্চ রেখে আগে কেবিনে এসে পার্থর নাম্বারে কল করে সে। কিন্তু ফোনটা বন্ধ পায় সে। সাথে সাথে নিজের বোকামির উপর বিরক্ত হয় সে। পার্থ এখন হয়তো সমাবেশে ব্যস্ত। তাকে কল দিয়েও লাভ নেই। তাই সে আসিফের নাম্বারে কল করে। কিছুক্ষণ ফোনটা বাজতেই অপরপাশ থেকে ফোন রিসিভ হয়। সাথে সাথে তরীর কানে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ এসে ঠেকে। সেই তীক্ষ্ণ শব্দ ভেদ করে আসিফ হন্তদন্ত স্বরে বলে উঠে,
“ এইখানে টিয়ার সেল আর বোমা ফালানো হইতেসে ভাবী। পরিস্থিতি বিগড়ায় আছে। “
চলবে…
[ কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ]
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো | পর্ব - ২৮ | ভালোবাসার গল্প | উপন্যাস এই পোস্ট টি পড়ার জন্য। আপনাদের পছন্দের সব কিছু পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন।
